ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ক্ষেত্রে আত্মসমর্পণের কোনো সুযোগ নেই বলে মন্তব্য করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেছেন, দেশে ফিরলে প্রথমেই তাকে গ্রেপ্তার করা হবে। এরপর আইনানুগ প্রক্রিয়ায় বিচারিক রায় কার্যকর করা হবে। আপিলের কোনো আইনগত সুযোগ থাকলে তা আদালত নির্ধারণ করবে।
বুধবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি মিলনায়তনে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল আয়োজিত ‘গণঅভ্যুত্থানের বাঁক বদলের দিন’ শীর্ষক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে আনতে সরকার আইনগত পদক্ষেপ নিয়েছে। প্রত্যর্পণ (এক্সট্রাডিশন) চুক্তির আওতায় অন্তর্বর্তী সরকারের সময় সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে চিঠি পাঠানো হয়েছে এবং পরবর্তী সময়ে তাগিদও দেওয়া হয়েছে। সরকার তাকে দেশে ফিরিয়ে এনে আদালতের রায় কার্যকর করতে চায় বলে জানান তিনি।
বিদেশে অবস্থানরত আওয়ামী লীগের সাবেক মন্ত্রী-এমপি এবং সরকারের সাবেক বিভিন্ন কর্মকর্তাদের প্রসঙ্গে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ফ্যাসিবাদের সহযোগী হিসেবে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের দেশে ফিরিয়ে আনতে ইন্টারপোলের মাধ্যমে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে তিনি সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদের গ্রেপ্তারের বিষয়টি উল্লেখ করে বলেন, তাকে দ্রুত দেশে ফিরিয়ে এনে বিচারের মুখোমুখি করার আশা করছে সরকার।
আওয়ামী লীগের সমালোচনা করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে সংঘটিত গণহত্যার জন্য দলটির কোনো অনুশোচনা নেই। বরং তারা আন্দোলনে অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের অপরাধী আখ্যা দিচ্ছে এবং আবারও রাজনীতিতে ফেরার স্বপ্ন দেখছে, যা অত্যন্ত নিন্দনীয়।
তিনি বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে দেশে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার হয়েছে। তবে এই অর্জন ধরে রাখা এখন সবার দায়িত্ব। জুলাই আন্দোলনের কৃতিত্ব কোনো একক ব্যক্তি বা দলের নয়; বরং দেশের সর্বস্তরের মানুষ ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধভাবে লড়াই করেছে।
সালাহউদ্দিন আহমদ আরও বলেন, রাষ্ট্র ও সংবিধানের গণতান্ত্রিক সংস্কারের লক্ষ্যে বিএনপি আগে থেকেই ৩১ দফা সংস্কার প্রস্তাব দিয়েছিল। জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের উদ্যোগে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের মতামত নিয়ে জুলাই জাতীয় সনদ প্রণয়ন করা হয়েছে। সেই সনদের আলোকে সংবিধান ও প্রয়োজনীয় আইন সংস্কারের প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেন তিনি।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে নিহত ও আহতদের বিষয়ে তিনি বলেন, তাদের সাংবিধানিক ও আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করা হবে এবং রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া হবে। এটি জুলাই জাতীয় সনদের অন্যতম অঙ্গীকার।
আওয়ামী লীগের বিচার প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-সংক্রান্ত আইন ও সন্ত্রাসবিরোধী আইনে সংশোধনের মাধ্যমে ব্যক্তি ও সংগঠন—উভয়ের বিরুদ্ধেই গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে বিচার পরিচালনার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। তবে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্বাহী আদেশে নয়, আইন ও বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই নির্ধারিত হওয়া উচিত বলে তিনি মত দেন।
তিনি অভিযোগ করেন, আওয়ামী লীগের ইতিহাস গণতন্ত্র ধ্বংস, একদলীয় শাসন প্রতিষ্ঠা এবং ছাত্ররাজনীতিকে কলঙ্কিত করার ইতিহাস। ভবিষ্যতে দেশে কোনো ফ্যাসিবাদী শক্তির উত্থান ঠেকাতে রাষ্ট্র কাঠামোর প্রয়োজনীয় সংস্কার জরুরি বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় গড়ে ওঠা জাতীয় ঐক্য ধরে রাখার আহ্বান জানিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, এই ঐক্য ভেঙে গেলে ফ্যাসিবাদের পুনরুত্থানের সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে। একই সঙ্গে তিনি বলেন, নির্মাণাধীন জুলাই স্মৃতি জাদুঘর ভবিষ্যৎ প্রজন্ম ও রাষ্ট্র পরিচালকদের জন্য একটি সতর্কবার্তা হিসেবে কাজ করবে, যাতে ভবিষ্যতে কোনো সরকার ফ্যাসিবাদী আচরণ করার সাহস না পায়।
ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিবের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব হাবিব উন নবী খান সোহেল। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক নাসির উদ্দিন নাসির। শেষে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে নিহতদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করে বিশেষ দোয়া ও মোনাজাত অনুষ্ঠিত হয়।