নীলাচল পরিবহনের বাসের সংখ্যা ৩৫০টি। এর ৯৫টি চলে ঢাকা থেকে কক্সবাজার, নোয়াখালী ও লক্ষ্মীপুরের মতো দূরপাল্লার রুটে। গত বৃহস্পতিবার ৩০টি বাস বন্ধ ছিল তেল সংকটে। কোম্পানিটির গাবতলী-নরসিংদী রুটের ৪০ বাসের ১৬টি বন্ধ ছিল ফিলিং স্টেশনে (তেলের পাম্প) যানবাহনের দীর্ঘ সারির কারণে জ্বালানি না পেয়ে।
নীলাচলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আফতাবউদ্দিন মাসুদ এই তথ্য জানিয়ে সমকালকে বলেছেন, এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে ঈদযাত্রায় ভোগান্তি নিশ্চিত। ঢাকা-কক্সবাজার রুটে আসা-যাওয়ায় ৩৫০ লিটার ডিজেল লাগে। পথে তেল কেনায় যাতে সময় নষ্ট না হয়, সেজন্য আগে বাসের ট্যাঙ্ক পূর্ণ করে ৪০০ লিটার ডিজেল একসঙ্গে ভরা হতো। কিন্তু সংকট শুরুর পর একসঙ্গে ১০০ লিটারের বেশি ডিজেল পাওয়া যাচ্ছে না। এই তেলে কক্সবাজার যাওয়া যায় না। পথে আবার তেল নিতে হয়।
তিনি আরও বলেন, পাম্পে ব্যক্তিগত যানবাহনের দীর্ঘ সারির কারণে তেল নিতে বাড়তি দুই-তিন ঘণ্টা সময় লাগছে। এ কারণে শুধু যাত্রীদের ভোগান্তি নয়, বাসের শিডিউলও এলোমেলো হচ্ছে। ঈদে গাড়ির চাপ বাড়বে। তখন যানজটও বাড়বে। এর সঙ্গে তেলের জন্য লাইন ধরার সময় যুক্ত হলে, ঈদযাত্রায় ব্যাপক দুর্ভোগ হবে।
একই কথা বলছেন অন্য মালিকরাও। তাদের ভাষ্য, সরকারের রেশনিং পদ্ধতি চালুর কারণে ভোগান্তি বেড়েছে। চাহিদা অনুযায়ী তেল না পেলে ঈদে অচলাবস্থা তৈরি হবে। অধিকাংশ বাস ঈদযাত্রার আগাম টিকিট, তেলের বর্তমান দাম অনুযায়ী বিক্রি করেছে। এই মুহূর্তে তেলের দাম বাড়লে, লোকসানও বাড়বে। যদিও সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম মালিকদের আশ্বস্ত করেছেন, তেলের দাম বাড়বে না। রোববার থেকে তেলের জোগান বাড়বে। সংকট থাকবে না।
সংকটে এখনই ভোগান্তি
ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের আগ্রাসনের পর বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সংকট তৈরি হয়েছে। তেল আমদানি কমেছে। মার্চে চট্টগ্রামে পৌঁছার কথা তিনটি জাহাজের আসা বিলম্বিত হয়েছে। এমন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকার রেশনিংয়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
ওই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, মোটরসাইকেলে দিনে সর্বোচ্চ দুই লিটার, ব্যক্তিগত গাড়িতে ১০ লিটার, এসইউভি, জিপ ও মাইক্রোবাসে ২০ থেকে ২৫ লিটার পর্যন্ত অকটেন বা পেট্রোল বিক্রি করা হচ্ছে।
ডিজেলচালিত পিকআপ ও লোকাল বাসে ৭০ থেকে ৮০ লিটার এবং দূরপাল্লার বাস, ট্রাক, কাভার্ডভ্যান ও কনটেইনারবাহী যানবাহনে ২০০ থেকে ২২০ লিটার পর্যন্ত সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছে।
সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব সাইফুল আলম সমকালকে বলেন, এই রেশনিংয়ের কারণেই সমস্যা তৈরি হয়েছে। পরে পাওয়া যাবে না– আশঙ্কায় মোটরসাইকেল, ছোট যানবাহন ভিড় করছে পাম্পগুলোতে। এতে বাসও দীর্ঘ সারিতে পড়ছে। তেলের সংকটের চেয়ে দীর্ঘ লাইন এখন বড় সমস্যা। সরকারের সঙ্গে কথা হয়েছে মালিক সমিতির। মন্ত্রী আশ্বস্ত করেছেন, রোববারের মধ্যে সমস্যা সমাধান হবে।
ঢাকা-রংপুর রুটে আগমনী পরিবহনের মালিক মোস্তফা আজাদ চৌধুরী বলেন, রমজানে যাত্রী কম থাকায় এখন পর্যন্ত বাস বন্ধ রাখা বা ট্রিপ বাতিলের ঘটনা ঘটেনি। তবে ১৬ মার্চ সন্ধ্যা থেকে চাপ বৃদ্ধি পেলে কী পরিস্থিতি হবে, তা বলা যাচ্ছে না।
এই পরিবহন মালিক জানান, দূরপাল্লার বাসগুলো নির্দিষ্ট ফিলিং স্টেশন থেকে তেল কেনে। আগমনী পরিবহন যে ফিলিং স্টেশন থেকে তেল কিনতে চুক্তিবদ্ধ, গাবতলীর সেই সব পাম্পে এখনই গাড়ির দীর্ঘ সারি রয়েছে। এতে বাড়তি সময় লাগছে ডিজেল কিনতে। রমজানে যাত্রীর চাপ না থাকায় যে বাস এখন ২৪ ঘণ্টায় একবার রংপুর যাচ্ছে এবং ফিরছে (এক ট্রিপ), ঈদে যাত্রীর ভিড়ের কারণে তা দুই ট্রিপ দেবে। ফিলিং স্টেশন থেকে নির্দিষ্ট সময়ে তেল না পেলে তা সম্ভব হবে না। তখন আর শিডিউল রক্ষা করা যাবে না, ভোগান্তি হবে।
সমধানের চেষ্টায় আরও সমস্যা
সরকারি সিদ্ধান্তে কৃচ্ছ্রতা সাধনে ডিজেল, পেট্রোল, অকটেনের সরবরাহ ২৫ শতাংশ কমানো হলেও বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) কোটা নীতিতে বাজারে সরবরাহ প্রায় ৪৫ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে বলে অভিযোগ করেছেন পাম্প মালিক ও পরিবেশকরা। মজুত ফুরিয়ে যাওয়ায় অনেক পাম্প বন্ধ রাখা হয়েছে। পরিস্থিতি সামলাতে শুক্র ও শনিবারও ডিপো খোলা রাখার নির্দেশ দিয়েছে বিপিসি।
সরবরাহ কমলেও বিপিসির হিসাবে তেলের বিক্রি বৃদ্ধি পেয়েছে। ভবিষ্যতে সংকট হতে পারে– এ গুজবে বহু মানুষ তেল কিনে মজুত করছেন। বিপিসির হিসাবে গত বছরের মার্চ থেকে জুন পর্যন্ত; প্রতিদিন গড়ে ১২ হাজার ২৯২ টন করে ডিজেল বিক্রি হয়েছে। চলতি মাসের প্রথম সাত দিনে প্রতিদিন গড়ে ১৭ হাজার ৮৯৯ টন করে ডিজেল বিক্রি হয়েছে, যা স্বাভাবিক চাহিদার ৪৭ শতাংশ বেশি।
বাস-ট্রাক চলে ডিজেলে। ডিজেল আমদানি করা হয়। জিপ, প্রাইভেট গাড়ি, মাইক্রোবাস, মোটরসাইকেল চলে অকটেন ও পেট্রোলে, যা দেশেই উৎপাদিত হয়। কিন্তু এই দুই জ্বালানিরও সংকট তৈরি হয়েছে চাহিদা ও বিক্রি বৃদ্ধি পাওয়ায়। বিপিসির হিসাবে আগের বছরের মার্চে গড়ে দিনে এক হাজার ২১৭ টন অকটেন বিক্রি হয়েছে। এ মাসে বিক্রি হচ্ছে এক হাজার ৫৯৪ টন। প্রায় ১২ শতাংশ বিক্রি বৃদ্ধি পেয়েছে। গত বছরের মার্চে দিনে গড়ে এক হাজার ৪২৭ টন পেট্রোল বিক্রি হতো। এখন বিক্রি হচ্ছে এক হাজার ৭৭৯ টন। প্রায় ২৫ শতাংশ বিক্রি বৃদ্ধি পেয়েছে।
পরিবহন মালিকরা সমকালকে বলেছেন, তেলের জন্য এই হুমড়ি খেয়ে পড়ার কারণেই সমস্যা আরও তীব্র হয়েছে। বাস মালিক মাহবুবুর রহমান বলেন, আগে ট্যাঙ্কি পূর্ণ করে ডিজেল নিতে সর্বোচ্চ ১০ মিনিট সময় লাগত। এখন লাগছে দুই থেকে তিন ঘণ্টা। এই ভিড় থাকলে, ঈদে আরও বেশি সময় লাগবে। এতে বাসগুলোর যাত্রী পরিবহন সময় কমবে। ফলে ভোগান্তি নিশ্চিত।
মহাসড়কেও সমস্যা
গত শনিবার ময়মনসিংহের মাসকান্দা বাসস্ট্যান্ড থেকে ইউনাইটেড পরিবহনের বাসে ঢাকায় আসা যাত্রাপথে দেখা যায়, বাসটি তিনটি ফিলিং স্টেশনে চেষ্টা করেও তেল পায়নি। দুটি দীর্ঘ সারি ছিল। আরেকটিতে ডিজেল ছিল না।
ইউনাইটেড পরিবহনের মালিকদের একজন সাইফুল আলম বলেছেন, কোম্পানিতে ৭০টি বাস চলে। অন্যান্য কোম্পানির মতোই নির্ধারিত ফিলিং স্টেশন থেকে চুক্তি অনুযায়ী ডিজেল কেনে। কিন্তু এসব প্রতিষ্ঠানে তেল সংকট বা দীর্ঘ সারির কারণে মহাসড়কে বাস থামিয়ে তেল নিতে হচ্ছে। এতে যাত্রাপথে বাড়তি সময় লাগছে। ঈদের ভিড়ে কোনোভাবেই মহাসড়কের ফিলিং স্টেশন থেকে তেল নিয়ে শিডিউল ঠিক রাখা যাবে না। এতে ফিলিং স্টেশন এলাকায় যানজট তৈরি হয়ে সমস্যা আরও বাড়বে।
একাধিক মালিক সমকালকে জানান, তেলের হিসাবে স্বচ্ছতা রাখতে অধিকাংশ বাস পূর্বনির্ধারিত ফিলিং স্টেশন থেকে তেল নেয়। চালক ও হেলপারের এতে সংশ্লিষ্টতা থাকে না। বাস মালিক চুক্তি অনুযায়ী ফিলিং স্টেশনকে তেলের দাম দেয়। কিন্তু সংকটের কারণে মহাসড়কের আশপাশে ফিলিং স্টেশন থেকে তেল কিনতে হওয়ায় মালিক সঠিক হিসাব পান না। তেল চুরির কারণে লোকসানে পড়েন মালিক। তাই নির্ধারিত ফিলিং স্টেশনে দীর্ঘ সারিতে অপেক্ষা করে হলেও তেল নিতে হচ্ছে।
এদিকে গতকাল শুক্রবার ছুটির দিনেও রাজধানীর আসাদগেট, বিজয় সরণি, পরীবাগ, মৎস্য ভবন মোড় এলাকার ফিলিং স্টেশনগুলোতে তেলের জন্য গাড়ির দীর্ঘ সারি দেখা গেছে। তবে ভিড় আগের তুলনায় কমেছে।
মন্ত্রীর আশ্বাস
পরিবহনমন্ত্রী রবিউল আলম গতকাল কমলাপুর স্টেশনে ঈদযাত্রার ট্রেন পরিদর্শনে গিয়ে বলেছেন, তেলের সমস্যা হবে না। তেলের দামও বাড়বে না। বিশেষ করে গণপরিবহনে যতটুকু তেল প্রয়োজন, ১৫ মার্চ থেকে অবাধে পাওয়া যাবে বলে নিশ্চিত করেছেন জ্বালানিমন্ত্রী।
ব্যক্তিগত পরিবহনের ক্ষেত্রে কী ব্যবস্থা থাকবে– প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ১৫ মার্চের পর থেকে রেশনিং ব্যবস্থা এভাবে থাকবে কিনা, তা পুনর্বিবেচনা করা হবে। কিছু না কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। এখনও তো সংকট থেকে বের হতে পারিনি। আশঙ্কা আছে, সংকটের মধ্যে আছি, আমাদের সক্ষমতা দিয়ে আমরা মোকাবিলা করতে চাচ্ছি।