রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে ‘ঢাল’ হিসেবে ব্যবহার, প্রথম দিনেই ড্রোন হামলায় নিহত ১৭ বাংলাদেশি

  প্রিন্ট করুন   প্রকাশকালঃ ১৪ অক্টোবর ২০২৬ ০৩:৪৬ অপরাহ্ণ   |   ৫৬ বার পঠিত
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে ‘ঢাল’ হিসেবে ব্যবহার, প্রথম দিনেই ড্রোন হামলায় নিহত ১৭ বাংলাদেশি

ঢাকা প্রতিনিধি:

 

রাশিয়ায় নির্মাণপ্রতিষ্ঠানে চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে ৩০ বাংলাদেশিকে দেশটিতে নিয়ে যাওয়ার পর রুশ সেনাবাহিনীর হাতে তুলে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে একটি মানব পাচার চক্রের বিরুদ্ধে। মাত্র ২১ দিনের সামরিক প্রশিক্ষণ শেষে তাঁদের পাঠানো হয় রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের সম্মুখসারিতে। সেখানে প্রতিপক্ষের অবস্থান শনাক্ত করতে তাঁদের ‘টোপ’ হিসেবে ব্যবহার করা হতো বলে প্রাথমিক অনুসন্ধানে জানতে পেরেছে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি)। এ ঘটনায় ড্রোন হামলায় অন্তত ২০ বাংলাদেশির মৃত্যুর তথ্য পেয়েছে সংস্থাটি। তাঁদের মধ্যে প্রথম দিনেই নিহত হন ১৭ জন।
 

বুধবার (১৪ অক্টোবর) রাজধানীর কারওয়ান বাজারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান এসআরবি-১০ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক অতিরিক্ত উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) মোহা. আসাদুজ্জামান। এ ঘটনায় মানব পাচার চক্রের অন্যতম দুই সদস্য জাবালে নূর ইন্টারন্যাশনালের প্রতিষ্ঠাতা মিজানুর রহমান (৫৫) ও আবু তাহের ওরফে লেন্টুকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে জানান তিনি।
 

এসআরবির তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ৭ মে জাবালে নূর, আরএস ইন্টারন্যাশনাল ও টিএস গ্রুপ নামের তিন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ৩০ বাংলাদেশিকে রাশিয়ায় পাঠানো হয়। নির্মাণপ্রতিষ্ঠানে চাকরির আশ্বাস দিয়ে প্রত্যেকের কাছ থেকে গড়ে প্রায় ১০ লাখ টাকা নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু রাশিয়ায় পৌঁছানোর পর তাঁদের প্রতিশ্রুত কর্মস্থলে নিয়োগ না দিয়ে রুশ সেনাবাহিনীর হাতে তুলে দেওয়া হয়। পরে মাত্র ২১ দিনের সামরিক প্রশিক্ষণ দিয়ে তাঁদের যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হয়।
 

সংবাদ সম্মেলনে মোহা. আসাদুজ্জামান বলেন, বাংলাদেশ থেকে যাঁদের নেওয়া হয়েছিল, তাঁদের যুদ্ধ করার মতো শারীরিক সক্ষমতা, পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ কিংবা কৌশলগত প্রস্তুতি ছিল না। এত অল্প সময়ের প্রশিক্ষণ দিয়ে তাঁদের যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানোর পেছনে অন্য উদ্দেশ্য ছিল বলে ধারণা করছে এসআরবি।
 

প্রাথমিক অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য তুলে ধরে তিনি জানান, প্রতিপক্ষের অবস্থান শনাক্ত করতে বাংলাদেশিদের একধরনের ‘টোপ’ হিসেবে সামনে পাঠানো হতো। তাঁদের লক্ষ্য করে ড্রোন হামলা চালানো হলে সেই হামলার সূত্র ধরে প্রতিপক্ষের অবস্থান ও দূরত্ব নির্ণয় করা সম্ভব হতো বলে ধারণা করা হচ্ছে।
 

এসআরবির অনুসন্ধান অনুযায়ী, যুদ্ধক্ষেত্রের প্রথম, মধ্য ও শেষভাগ—এই তিন অংশে বাংলাদেশিদের মোতায়েন করা হয়েছিল। তাঁদের মধ্যে প্রথম দিনেই ড্রোন হামলায় ১৭ জন নিহত হন। পরবর্তী সময়ে আরও তিনজনের মৃত্যুর তথ্য পাওয়া যায়। সব মিলিয়ে রাশিয়ায় পাঠানো ৩০ বাংলাদেশির মধ্যে ২০ জনের মৃত্যুর বিষয়ে প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত হয়েছে সংস্থাটি।
 

জীবিতদের বিষয়ে এসআরবি জানায়, আহত অবস্থায় দুজন দেশে ফিরেছেন। তাঁদের একজন রাজন। তাঁর বর্ণনা অনুযায়ী, যুদ্ধক্ষেত্রে ড্রোনের আঘাতে তাঁর কোমর ভেঙে যায় এবং শরীরের নিচের অংশ অবশ হয়ে পড়ে। এমন অবস্থায় বুকের ওপর ভর দিয়ে প্রায় চার কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে তিনি ক্যাম্পে পৌঁছান।
 

বাকি আটজনের মধ্যে দুজন মস্কোর একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। অন্য ছয়জন এখনো যুদ্ধক্ষেত্রে অবস্থান করছেন বলে জানিয়েছে এসআরবি।
 

মানব পাচার চক্রের সঙ্গে বাংলাদেশিদের পাশাপাশি রাশিয়ার ইগর নামের এক ব্যক্তি এবং কিরগিজস্তানের জুলিয়া নামের এক নারী জড়িত ছিলেন বলে প্রাথমিকভাবে তথ্য পাওয়া গেছে। তাঁদের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহের পাশাপাশি অভিযান চলছে। এ ছাড়া চক্রের আরেক সদস্য মোস্তাফিজুরকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে বলে জানান এসআরবি-১০ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক।
 

মোহা. আসাদুজ্জামান আরও বলেন, প্রাথমিক অনুসন্ধানে জানা গেছে, রাশিয়ার যুদ্ধে বিভিন্ন দেশের নাগরিকদের একই কৌশলে যুক্ত করা হয়েছে। বাংলাদেশ থেকেও গোপালগঞ্জ, ময়মনসিংহ, নারায়ণগঞ্জ, জামালপুর, পাবনা, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, ফরিদপুর, রাজবাড়ী ও গাজীপুরের বাসিন্দারা গেছেন বলে তথ্য পাওয়া গেছে।
 

তিনি বলেন, ভুক্তভোগীদের অধিকাংশই দরিদ্র পরিবারের সন্তান। তাঁদের কেউ কেউ ঋণ করে বিদেশে পাড়ি জমিয়েছিলেন। এখন পরিবারের সদস্যরা স্বজনের মৃত্যুসংবাদ পেলেও অনেক ক্ষেত্রে তাঁদের মরদেহ দেখতে পারছেন না। এমনকি মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার সুযোগও পাচ্ছেন না।
 

বিদেশে চাকরির প্রলোভনে অর্থ লেনদেনের আগে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বৈধতা যাচাই এবং বিদেশযাত্রার ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বনের আহ্বান জানান এসআরবি-১০ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক।