বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার পবিত্রতা রক্ষায় যে প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকা রাখার কথা, তারাই আজ পরিণত হয়েছে অনিয়ম ও দুর্নীতির আখড়ায়। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের (ডিআইএ) সামপ্রতিক এক তদন্ত প্রতিবেদনে রাজধানীর সিদ্ধেশ্বরী উচ্চ বালিকা বিদ্যালয় এবং ময়মনসিংহের হালুয়াঘাটের বনপাড়া আদর্শ স্কুল অ্যান্ড কলেজের ভয়াবহ চিত্র বেরিয়ে এসেছে। প্রতিবেদনে ১৪১ জন শিক্ষকের নিয়োগকে ‘অবৈধ’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে এবং প্রায় ১৫ কোটি টাকা তছরুপের চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। এই ঘটনা শিক্ষা খাতের সংস্কার ও জবাবদিহিতার দাবিকে আবারও তীব্র করে তুলেছে।
রাজধানীর স্বনামধন্য সিদ্ধেশ্বরী উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ে ডিআইএ’র অনুসন্ধানে এক ভয়াবহ চিত্র ফুটে উঠেছে। ১৩৩ জন শিক্ষকের মধ্যে ৬৮ জনেরই নিয়োগ অবৈধ। তাদের নিয়োগের ক্ষেত্রে সনদ জালিয়াতি, ভুয়া অভিজ্ঞতা সনদ এবং এনটিআরসিএ’র জাল সনদ ব্যবহারের প্রমাণ মিলেছে।
প্রতিবেদনের কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য— আর্থিক দুর্নীতি: সাবেক ও বর্তমান প্রধান শিক্ষকদের বিরুদ্ধে উৎসব ভাতা ও বেতন-ভাতা বাবদ প্রায় পৌনে ২ কোটি টাকা অবৈধভাবে উত্তোলনের অভিযোগ রয়েছে। তহবিল তছরুপ: প্রতিষ্ঠানের প্রায় ৮ কোটি টাকার তহবিল নিয়মবহির্ভূতভাবে বিভিন্ন আর্থিক লিজিং কোম্পানিতে এফডিআর করে রাখা হয়েছে, যা বিধিবহির্ভূত। ক্রয় ও মেরামত জালিয়াতি: জেনারেটর, লিফট এবং অবকাঠামো নির্মাণের নামে বড় ধরনের অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে। এমনকি প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে অনুদান দেয়ার সময়ও দেড় লাখ টাকা আত্মসাতের নজির পাওয়া গেছে। কোচিং বাণিজ্য: কোচিং বাবদ সংগৃহীত অর্থের কোনো হিসাব বা রসিদ খুঁজে পাওয়া যায়নি।
ময়মনসিংহের হালুয়াঘাটের বনপাড়া আদর্শ স্কুল অ্যান্ড কলেজ এই প্রতিষ্ঠানটির চিত্রটি আরও ভয়াবহ। এখানে ৭৫ জন শিক্ষকের মধ্যে ৭৩ জনের নিয়োগই অবৈধ। প্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষ ইমদাদুল হক নিজেই সনদ জালিয়াতির আশ্রয় নিয়েছেন এবং শিক্ষক নিয়োগের নামে ঘুষবাণিজ্য চালিয়েছেন। সবচেয়ে জঘন্য বিষয়টি হলো, অধ্যক্ষ তার পরিবারের ১১ জন সদস্যকে বিভিন্ন পদে নিয়োগ দিয়েছেন। স্ত্রী, সন্তান, ছেলের বউ, বোন, বোনের জামাই, শ্যালকের স্ত্রী- কেউ বাদ যাননি। এমনকি প্রতিষ্ঠানের জন্য নিয়োগ দেয়া ব্যক্তিগত গাড়িচালকও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বেতনভুক্ত কর্মচারী হিসেবে জায়গা পেয়েছেন। এহেন জালিয়াতির মাধ্যমে সরকারি কোষাগারের ৫ কোটি ৫৭ লাখ টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। ডিআইএ’র সুপারিশ অনুযায়ী, অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি ফৌজদারি মামলা দায়েরের পথ প্রশস্ত হয়েছে।
কেবল এই দুটি স্কুল নয়, সারা দেশে ডিআইএ’র তদন্তে এ পর্যন্ত প্রায় দেড় হাজার শিক্ষকের সনদ জালিয়াতির তথ্য পাওয়া গেছে। এসব শিক্ষককে শোকজ করা হয়েছে। অবাক করার বিষয় হলো, এদের বেতন-ভাতা বাবদ বিগত বছরগুলোতে রাষ্ট্র প্রায় ৩৭৫ কোটি টাকা ব্যয় করেছে। ডিআইএ এই বিশাল অংকের অর্থ জালিয়াতি চক্রের কাছ থেকে ফেরত নেয়ার জন্য সরকারের কাছে কঠোর সুপারিশ করেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে ম্যানেজিং কমিটির দৌরাত্ম্য, নিয়োগ প্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ এবং তদারকি সংস্থার দুর্বলতাই এই ধরনের অপরাধের মূল কারণ। যখন একটি প্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষ থেকে শুরু করে ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি পর্যন্ত সবাই দুর্নীতির সাথে জড়িয়ে পড়েন, তখন সাধারণ শিক্ষার্থীদের গুণগত শিক্ষা পাওয়ার পথ রুদ্ধ হয়ে যায়।
ডিআইএ’র পরিচালক এম এম সহিদুল ইসলাম গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, তদন্ত প্রতিবেদন মন্ত্রণালয়ে জমা দেয়া হয়েছে এবং মন্ত্রণালয় পরবর্তী আইনানুগ পদক্ষেপ গ্রহণ করবে। সচেতন নাগরিক সমাজ ও শিক্ষাবিদরা মনে করছেন, কেবল প্রতিবেদন জমা দেয়াই যথেষ্ট নয়। বরং প্রতিটি জালিয়াতির পেছনে থাকা সিন্ডিকেটকে চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনতে হবে। জালিয়াতির মাধ্যমে হাতিয়ে নেয়া প্রতিটি টাকা সরকারি কোষাগারে ফিরিয়ে আনা এখন সময়ের দাবি। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো জাতির মেরুদণ্ড তৈরির কারখানা।
কিন্তু সিদ্ধেশ্বরী উচ্চ বালিকা বিদ্যালয় কিংবা বনপাড়া আদর্শ স্কুল অ্যান্ড কলেজের মতো ঘটনা প্রমাণ করে যে, এই মেরুদণ্ড কতটা ভঙ্গুর হয়ে পড়েছে। সনদ জালিয়াতি করে শিক্ষক হওয়া কেবল আইনবিরোধী নয়, এটি নৈতিকতার চরম অবক্ষয়। এই ১৪১ জন শিক্ষক এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কর্তাব্যক্তিদের কর্মকাণ্ড আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি করেছে। রাষ্ট্র যদি এই জালিয়াতি চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর ও দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হয়, তবে ভবিষ্যতে মেধাবী ও প্রকৃত শিক্ষকরা মূল্যায়িত হবেন না। বর্তমান সময়টি শিক্ষা খাতে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি বাস্তবায়নের।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, শিক্ষা মন্ত্রণালয় এই জঘন্য দুর্নীতির বিরুদ্ধে দ্রুততম সময়ে চূড়ান্ত আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করে দেশবাসীকে ন্যায়বিচারের আশ্বাস প্রদান করবেন।