মধ্যপ্রাচ্যের আকাশ এখন বারুদের গন্ধে ভারী। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া ইরান এবং ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্র যৌথ বাহিনীর মধ্যকার সংঘাত আজ সোমবার ১৭তম দিনে পদার্পণ করেছে। দীর্ঘ দুই সপ্তাহের বেশি সময় ধরে চলা এই বিধ্বংসী যুদ্ধে ইসরায়েলের অভ্যন্তরে ক্ষয়ক্ষতির একটি ভয়াবহ চিত্র সামনে এসেছে।
ইসরায়েলের জরুরি পরিষেবা সংস্থা মাগেন ডেভিড অ্যাডম (এমডিএ)-এর সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, ১৭ দিনের এই রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে এখন পর্যন্ত ১৫ জন ইসরায়েলি নাগরিক নিহত হয়েছেন। একই সাথে আহতের সংখ্যা ছাড়িয়েছে ৯০০-এর ঘর।
হতাহতের পরিসংখ্যান ও বর্তমান পরিস্থিতি
এমডিএ-এর প্রকাশিত বুলেটিনে জানানো হয়েছে যে, নিহত ১৫ জন ছাড়াও এই যুদ্ধে অন্তত ৯০০ জনের বেশি ইসরায়েলি আহত হয়েছেন। আহতদের মধ্যে অনেকের অবস্থা আশঙ্কাজনক।
অন্তত ৫ জন বর্তমানে জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে রয়েছেন। রোববার এক দিনেই ইসরায়েলের বিভিন্ন প্রান্তে ইরানের পাল্টা হামলায় ৬৯ জন আহত হয়েছেন।
তেল আবিবসহ ইসরা
য়েলের প্রধান শহরগুলোতে ইরানের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ফলে অসংখ্য আবাসিক ভবন ও স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও সংবাদ সংস্থা এএফপি-এর ছবিতে দেখা গেছে, তেল আবিবের ক্ষতিগ্রস্ত ভবনগুলোতে ইসরায়েলি নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা উদ্ধার তৎপরতা চালাচ্ছেন।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল সম্মিলিতভাবে ইরানে বড় ধরনের সামরিক অভিযান শুরু করার পর থেকে এই সংকটের সূত্রপাত। ইরানও দমে না থেকে তাদের 'রিভল্যুশনারি গার্ডস' (আইআরজিসি)-এর মাধ্যমে একের পর এক পাল্টা হামলা চালিয়ে যাচ্ছে।
ইরান দাবি করেছে যে, তারা ইরাক ও কুয়েতে অবস্থিত তিনটি মার্কিন ঘাঁটিতে সফল হামলা চালিয়েছে। এছাড়া আল-আসাদসহ আরও চারটি মার্কিন বিমানঘাঁটিতে ড্রোন হামলার দাবি করেছে আইআরজিসি। অন্যদিকে, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ হামলায় ইরানের ইসফাহান শহরে অন্তত ১৫ জন নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
এই যুদ্ধকে কেন্দ্র করে বিশ্বনেতারা চরম উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ বলেছেন, "এই অনিয়ন্ত্রিত উত্তেজনা পুরো মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলকে এক ভয়াবহ বিশৃঙ্খলার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।"
যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বর্তমান প্রশাসনের সমালোচনা করে ন্যাটোকে সতর্ক করেছেন এবং পারস্য উপসাগরে মার্কিন রণতরি পাঠানোর বিষয়ে যুদ্ধের উসকানি না দিতে সতর্কবার্তা দিয়েছেন।
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি অভিযোগ করেছেন যে, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ব্যবহারের জন্য ইরানকে উন্নত ড্রোন সরবরাহ করছে রাশিয়া।
যুদ্ধের পাশাপাশি সাইবার ও তথ্যযুদ্ধও সমানতালে চলছে। ইরান সরকার দাবি করেছে, তারা 'শত্রুপক্ষকে' গোপন তথ্য পাচারের অভিযোগে দেশজুড়ে অন্তত ৫০০ জনকে গ্রেপ্তার করেছে। ইরানের সাবেক কর্মকর্তা আলী লারিজানি অভিযোগ তুলেছেন যে, পশ্চিমারা ইরানের বিরুদ্ধে ‘৯/১১’-এর মতো বড় কোনো ট্র্যাজেডি ঘটানোর ষড়যন্ত্র করছে।
এদিকে, পারস্য উপসাগরের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক পথ হরমুজ প্রণালী নিয়েও উত্তেজনা তুঙ্গে। ব্রিটেন সেখানে ড্রোন মোতায়েনের কথা ভাবছে এবং মার্কিন ও ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ নৌযান চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে জোট গঠনের আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে।
আজ যুদ্ধের ১৭তম দিনেও বাগদাদ বিমানবন্দর থেকে শুরু করে বৈরুত এবং তেল আবিব পর্যন্ত রকেট ও ক্ষেপণাস্ত্রের গর্জন থামেনি। যুদ্ধের কারণে সাধারণ মানুষ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। একদিকে ইসরায়েলি নাগরিকদের প্রাণহানি, অন্যদিকে ইরানে সাধারণ মানুষের মৃত্যু সব মিলিয়ে এক মানবিক বিপর্যয়ের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে বিশ্ব। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানালেও আপাতত আলোচনার কোনো সংকেত দেখা যাচ্ছে না।