সোমবার সকাল ১০টায় ইরানি বন্দর অবরোধ শুরু হবে: ট্রাম্প

  প্রিন্ট করুন   প্রকাশকালঃ ১৩ এপ্রিল ২০২৬ ১১:৫০ পূর্বাহ্ণ   |   ৫৫ বার পঠিত
সোমবার সকাল ১০টায় ইরানি বন্দর অবরোধ শুরু হবে: ট্রাম্প

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, আজ সোমবার সকাল ১০টা থেকে ইরানের সব বন্দর অবরোধ করা হবে।

আজ সোমবার নিজ মালিকানাধীন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে এ তথ্য জানান ট্রাম্প। এর আগে, গতকাল রোববার ট্রাম্প ইরানের বন্দরগুলো অবরোধের ঘোষণা দেন।

ট্রুথের পোস্টে ট্রাম্প লিখেছেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র ১৩ এপ্রিল সকাল ১০টায় (পশ্চিমা সময়) ইরানের বন্দরে প্রবেশকারী বা বন্দর ত্যাগকারী জাহাজগুলোকে অবরোধ করবে। এই বিষয়ে আপনাদের মনোযোগের জন্য ধন্যবাদ!।’

পাকিস্তানে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনা সফল না হওয়ায় হরমুজ প্রণালি নিয়ে নতুন হুঁশিয়ারি দেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। গতকাল রোববার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালের এক পোস্টে ট্রাম্প বলেন, ভবিষ্যতে হরমুজ প্রণালি দিয়ে মুক্তভাবে জাহাজ চলাচলের একটি চুক্তি হতে পারে। কিন্তু ইরানের বাধার কারণে তা হচ্ছে না।

যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনী অবিলম্বে টোল দিয়ে হরমুজ প্রণালিতে প্রবেশ করা বা সেখান থেকে বের হওয়া সমস্ত জাহাজ আটকে দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করবে।

ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দেন, যে ওই অবৈধ টোল দেবে, সে নিরাপদে চলতে পারবে না। আর ইরান যদি মার্কিন বা অন্য কোনো জাহাজে হামলা চালায় তাহলে কঠোর জবাব দেওয়া হবে। পরে তিনি বলেন, ‘খুব শিগগিরই এই অবরোধ শুরু হবে। এ হুমকির পরদিন ট্রাম্প এমন ঘোষণা দিলেন।

ইরানের বন্দরগুলো অবরোধের মার্কিন ঘোষণার পর বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম বেড়েছে। আজ সোমবার আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের মানদণ্ড হিসেবে পরিচিত ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম ৭ শতাংশ বেড়েছে। বর্তমানে প্রতি ব্যারেল তেল ১০২ দশমিক ২৯ ডলারে বিক্রি হচ্ছে। 

যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ৮ শতাংশ বেড়ে প্রতি ব্যারেল ১০৪ দশমিক ২৪ ডলারে পৌঁছেছে।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান যুদ্ধ শুরুর আগে তেলের দাম ছিল ব্যারেলপ্রতি প্রায় ৭০ ডলার। যুদ্ধের প্রভাবে বিভিন্ন সময়ে তা ১১৯ ডলারও ছাড়িয়ে যায়।

এর আগে, গত শুক্রবার পাকিস্তানে বৈঠকের খবরের মধ্যে জুনে সরবরাহের জন্য তেলের দাম কিছুটা কমে ব্যারেলপ্রতি ৯৫ দশমিক ২০ ডলারে নামে।

ইরানের সর্বোচ্চ নেতার একজন জ্যেষ্ঠ সামরিক উপদেষ্টা বলেছেন, যেকোনো নৌ অবরোধে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যর্থতা নিশ্চিত।

হরমুজ প্রণালি অবরোধের বিষয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের হুমকির প্রেক্ষাপটে এ মন্তব্য করেছেন ইরানের সর্বোচ্চ নেতার জ্যেষ্ঠ সামরিক উপদেষ্টা মোহসেন রেজাই।

মোহসেন রেজাই বলেন, যেভাবে হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার চেষ্টা করতে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের কাছে একটি ঐতিহাসিক পরাজয়ের মুখে পড়েছিল, তেমনিভাবে যেকোনো নৌ অবরোধের ক্ষেত্রেও তারা ব্যর্থ হতে বাধ্য।

নৌ অবরোধ প্রসঙ্গে মোহসেন রেজাই বলেন, ইরানের সশস্ত্র বাহিনী যুক্তরাষ্ট্রের এমন কোনো পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করতে দেবে না। ইরানের সামরিক বাহিনীর ‘গুরুত্বপূর্ণ অপ্রকাশিত সক্ষমতা’ রয়েছে, যা যেকোনো হুমকির জবাব দিতে পারে। মোহসেন রেজাই আরও বলেন, ইরান এমন কোনো দেশ নয়, যাকে টুইট বা কাল্পনিক অবরোধ পরিকল্পনা দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করা যাবে।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী ঘোষণা করেছে, তারা আজ সোমবার থেকে ইরানের সব বন্দর অবরোধ করতে শুরু করবে।গতকাল রোববার সন্ধ্যায় এক বিবৃতিতে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের স্থানীয় সময় আজ ১৩ এপ্রিল পূর্বঞ্চলীয় সময় সকাল ১০টা (গ্রিনিচ মান সময় বেলা ২টা) থেকে ‘ইরানের বন্দরগুলোতে প্রবেশকারী এবং সেখান থেকে বের হওয়া সমস্ত সামুদ্রিক ট্রাফিকে’র ওপর এই অবরোধ প্রযোজ্য হবে। এর মধ্যে পারস্য উপসাগর এবং ওমান উপসাগরসহ ইরানের বন্দর ও উপকূলীয় এলাকায় প্রবেশকারী বা প্রস্থানকারী ‘সব দেশের জাহাজ’ অন্তর্ভুক্ত থাকবে।

তবে সেন্টকম জানিয়েছে, মার্কিন বাহিনী ‘ইরানি নয় এমন বন্দরগুলোতে যাতায়াতকারী জাহাজের জন্য হরমুজ প্রণালিতে চলাচলের স্বাধীনতায় বাধা দেবে না।’ 

এটি প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আগের হুমকি থেকে কিছুটা পিছিয়ে আসা বলে মনে হচ্ছে, যেখানে তিনি পুরো প্রণালি অবরোধ করার এবং ইরানকে টোল প্রদানকারী জাহাজগুলোকে ধাওয়া করার হুমকি দিয়েছিলেন।

ওয়াশিংটন ডিসি থেকে আল জাজিরার হেইডি ঝো-কাস্ত্রো বলেন, ‘এখানে অনেক প্রশ্ন রয়েছে।’ তিনি মার্কিন পক্ষের দেওয়া সাংঘর্ষিক তথ্যের দিকে ইঙ্গিত করে বলেন, ’ট্রাম্প বলেছিলেন অবরোধটি হরমুজ প্রণালিতে প্রবেশ বা প্রস্থান করার চেষ্টাকারী যেকোনো এবং সমস্ত জাহাজকে লক্ষ্য করে হবে। কিন্তু সেন্টকম বলছে এটি কেবল ইরানি বন্দরে যাতায়াতকারী জাহাজগুলোকে লক্ষ্য করবে।’

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করার পর থেকে ইরান মূলত বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের গুরুত্বপূর্ণ পথ হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে। এর পর থেকে এই জলপথ দিয়ে জাহাজ চলাচল এতটাই কমে গেছে যে বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) সরবরাহ স্থবির হয়ে পড়েছে।

ইরান প্রণালি দিয়ে তাদের নিজস্ব জাহাজ চলাচল অব্যাহত রেখেছে এবং অন্যান্য দেশের সীমিতসংখ্যক জাহাজকে চলাচলের অনুমতি দিচ্ছে। ইরানি কর্মকর্তারা যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর একটি টোল সিস্টেম বা মাশুল ব্যবস্থা চালুর বিষয়েও আলোচনা করেছেন।

ট্রাম্পের অবরোধের হুমকির জবাবে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) এক বিবৃতিতে বলেছে, যেকোনো অগ্রসরমাণ সামরিক জাহাজকে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধবিরতির লঙ্ঘন হিসেবে গণ্য করা হবে—যা ২২ এপ্রিল পর্যন্ত কার্যকর থাকার কথা—এবং তাদের বিরুদ্ধে ‘কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

যুক্তরাষ্ট্রের ঘোষিত এই অবরোধ পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার কারণে শুরু হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে, যা পুনরায় যুদ্ধ শুরুর আশঙ্কা বাড়িয়ে দিয়েছে। ইরানি কর্মকর্তারা চুক্তি না হওয়ার জন্য মার্কিন পক্ষকে দায়ী করেছেন। 

পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি বলেছেন, যখন একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের একদম কাছাকাছি ছিল, তখন মার্কিন আলোচকরা শর্ত পরিবর্তন করে এবং প্রচেষ্টায় বাধা সৃষ্টি করে। তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক জোহরে খারাজমি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানিদের ওপর কোনো কিছু ‘চাপিয়ে দেওয়ার অবস্থানে নেই’ কিংবা ‘কোন জাহাজ চলাচল করবে তা বেছে দেওয়ার অবস্থানেও নেই।’

তিনি আরও বলেন, ‘যদি এই অবরোধ ইসলামি প্রজাতন্ত্রের সহনশীলতা বনাম বৈশ্বিক বাজারের সহনশীলতার প্রতিযোগিতায় পরিণত হয়, তবে কে হারছে তা দেখতে বেশি সময় লাগবে না। ইরান দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত।’ তিনি যোগ করেন, ‘প্রযুক্তিগতভাবে তারা (যুক্তরাষ্ট্র) পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম নয়। হলিউড-স্টাইল কৌশল দিয়ে তারা এই যুদ্ধক্ষেত্রে জয়ী হতে পারবে না।’