রাজস্ব ও আর্থিক খাতে সংস্কার কার্যক্রমে ধীরগতির কারণে আইএমএফের নির্ধারিত মিশন এপ্রিলের পরিবর্তে আগামী জুলাইয়ে পাঠানোর সিদ্ধান্ত আগেই নেওয়া হয়। গত ২৪ মার্চ সংস্থাটির এশিয়া ও প্যাসিফিক বিভাগের পরিচালক কৃষ্ণ শ্রীনিবাসন ঢাকা সফরে এসে এ তথ্য জানান। এর ফলে জুনের আগে নির্ধারিত দুই কিস্তিতে ১৩০ কোটি ডলার ছাড় পাওয়া অনিশ্চিত হয়ে পড়ে।
এদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনে ১৩ থেকে ১৮ এপ্রিল অনুষ্ঠিত বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের বসন্তকালীন বৈঠকে অর্থমন্ত্রীর নেতৃত্বে বাংলাদেশের প্রতিনিধি দল সংস্থাটির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করে। বৈঠকে চলমান ঋণ কর্মসূচি ও অতিরিক্ত ঋণ সহায়তা নিয়ে আলোচনা হলেও আইএমএফ একাধিক শর্ত পূরণের ওপর জোর দেয়।
আইএমএফের শর্তগুলোর মধ্যে রয়েছে— জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি, প্রান্তিক জনগোষ্ঠী ছাড়া অন্যান্য খাতে ভর্তুকি প্রত্যাহার, করছাড় বাতিল এবং অভিন্ন ভ্যাট হার চালু। পাশাপাশি ব্যাংকিং ও রাজস্ব খাতে কাঠামোগত সংস্কার জোরদার করার কথাও বলা হয়েছে। তবে সরকার এসব শর্ত পুরোপুরি মানতে রাজি নয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
বিশেষ করে নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে ভর্তুকি অব্যাহত রাখা প্রয়োজন বলে মনে করছে সরকার। অন্যদিকে একক ১৫ শতাংশ ভ্যাট হার চালু হলে মূল্যস্ফীতি আরও বাড়তে পারে—এ আশঙ্কাও রয়েছে। ফলে এসব বিষয়ে আপাতত কঠোর অবস্থান নিচ্ছে সরকার।
অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী দাবি করেছেন, জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির সঙ্গে আইএমএফের শর্তের সরাসরি কোনো সম্পর্ক নেই। তবে অর্থ মন্ত্রণালয়ের একাধিক সূত্র বলছে, আইএমএফের শর্ত পূরণও দাম বৃদ্ধির একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ। কারণ, আইএমএফের অর্থ ছাড়ের ওপর অন্যান্য উন্নয়ন সহযোগীদের অর্থায়ন অনেকাংশে নির্ভর করে।
জ্বালানি খাতে সংকট মোকাবিলায় সরকার ইতোমধ্যে বিভিন্ন দাতা সংস্থার কাছে প্রায় ৩১৫ কোটি ডলার সহায়তা চেয়েছে। এ ক্ষেত্রে আইএমএফের ইতিবাচক অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
২০২৩ সালের জানুয়ারিতে আইএমএফের সঙ্গে চুক্তি অনুযায়ী, ২০২৭ সালের মধ্যে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে ভর্তুকি শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল বাংলাদেশ। সেই লক্ষ্য পূরণে আগামী বাজেটে ভর্তুকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানোর চাপ রয়েছে। পাশাপাশি ২০২৭-২৮ অর্থবছরের মধ্যে সব ধরনের করছাড় তুলে দেওয়ার সুপারিশও করেছে সংস্থাটি।
রাজস্ব খাতে লক্ষ্যমাত্রা অর্জনেও পিছিয়ে রয়েছে বাংলাদেশ। চলতি অর্থবছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত আইএমএফ নির্ধারিত ২ লাখ ৪৭ হাজার ৮০০ কোটি টাকার বিপরীতে আদায় হয়েছে মাত্র ১ লাখ ৬৬ হাজার কোটি টাকা। সংস্থাটি প্রতিবছর জিডিপির অন্তত শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ হারে অতিরিক্ত রাজস্ব আহরণের শর্ত দিলেও তা এখনও পূরণ হয়নি।
রাজস্ব খাত সংস্কারের অংশ হিসেবে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড পুনর্গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা বাস্তবায়ন করা যায়নি। অধ্যাদেশ জারি হলেও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আন্দোলনের মুখে তা থেমে যায়। নতুন সরকারও এ বিষয়ে এখনো কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি, যা আইএমএফের সঙ্গে মতপার্থক্যের একটি কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অন্যদিকে ব্যাংক খাত সংস্কারেও অগ্রগতি সন্তোষজনক নয় বলে মনে করছে আইএমএফ। খেলাপি ঋণের সংজ্ঞা পরিবর্তন, ব্যাংক পরিচালকদের কাঠামো নির্ধারণ এবং ব্যাংক কোম্পানি আইন সংশোধনের মতো গুরুত্বপূর্ণ শর্তগুলো গত কয়েক বছরে বাস্তবায়িত হয়নি। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণ ১০ শতাংশের নিচে নামানোর লক্ষ্যও অর্জিত হয়নি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সুশাসন ও স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করতে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আইন সংশোধনের উদ্যোগ না নেওয়ায় সংস্থাটি অসন্তোষ প্রকাশ করেছে। এছাড়া নতুন ব্যাংক রেজল্যুশন আইনে সমস্যাগ্রস্ত ব্যাংকের পুরোনো মালিকদের পুনরায় ফিরে আসার সুযোগ রাখার বিষয়েও আপত্তি জানিয়েছে আইএমএফ।
এ অবস্থায় রাজস্ব আদায়ে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি না থাকলেও আগামী অর্থবছরের জন্য প্রায় ৯ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকার বাজেট প্রণয়নের পরিকল্পনা করছে সরকার, যা বর্তমান বাজেটের তুলনায় প্রায় ১৮ শতাংশ বেশি। সীমিত আর্থিক সক্ষমতার মধ্যেও ব্যয় বৃদ্ধির এই পরিকল্পনায়ও আপত্তি জানিয়েছে আইএমএফ।
সব মিলিয়ে আইএমএফের শর্ত পূরণে সরকারের অনাগ্রহ এবং সংস্কার কার্যক্রমে ধীরগতির কারণে ভবিষ্যৎ ঋণ সহায়তা নিয়ে অনিশ্চয়তা আরও গভীর হচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।