মেয়েদের সাহসী ও সোচ্চার হতে হবে

  প্রিন্ট করুন   প্রকাশকালঃ ০৮ মার্চ ২০২৬ ০১:৪৪ অপরাহ্ণ   |   ৯ বার পঠিত
মেয়েদের সাহসী ও সোচ্চার হতে হবে

ক্রিকেটে সাথীরা জাকির জেসির হাতেখড়ির সময়টা ছিল দেশের ক্রিকেটেরও শৈশব। জেসিদের বড় হওয়ার সঙ্গে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে জায়গা করে নিয়েছে বাংলাদেশের নারী ক্রিকেট। এশিয়ান গেমসে রৌপ্যপদক জয়, টি২০ এশিয়া কাপে শিরোপা জিতেছে পালাক্রমে। এই উত্থানের পেছনে আছে অনেক গল্প। নানা প্রতিকূলতা পেরিয়ে আজকের বিশ্বমঞ্চে জায়গা করে নিয়েছেন জেসি। উপস্থাপক ও ধারাভাষ্যকার ছিলেন। এখন তিনি আন্তর্জাতিক আম্পায়ার। বিশ্ব নারী দিবস উপলক্ষে সাথীরা জাকির জেসির একান্ত সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সেকান্দার আলী।

 

সমকাল: দেশের নারী ক্রিকেটে প্রথম দিকের একজন আপনি। ওই সময়ে পরিবার থেকে কেমন সমর্থন পেয়েছেন?
জেসি: 
শুরুর দিকে একটু কঠিন ছিল। যেহেতু বাংলাদেশ দলে আমরাই প্রথম খেলেছি। পরিবার থেকে বলা হতো ক্রিকেটে মেয়েদের ভবিষ্যৎ কী? এখন মেয়েদের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে সবাই জানে। পরিবার থেকে সমর্থন করে। ভালো দিক হলো মেয়েদের ক্রিকেটে পেশাদারিত্ব এসেছে। আমাদের সময়ে ক্রিকেট খেলে আয় করা সম্ভব ছিল না। দেশের জার্সিতে খেলব, সেটাই ছিল মূল লক্ষ্য। পরিবার চাইত আমরা পড়াশোনা করি। জাতীয় দলে খেললেও আর্থিকভাবে লাভবান হওয়ার সুযোগ ছিল না। এখন তো অনেক সুযোগ-সুবিধা। জাতীয় দলে খেলার কারণে এখনও অনেক সম্মান পাই। আম্পায়ারিংয়ের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার থাকে। আমরা সে সময়ে চ্যালেঞ্জটা নিয়েছিলাম বলেই আজ নারী ক্রিকেট প্রতিষ্ঠা পেয়েছে।

 

সমকাল: দেশের অনেক প্রথমের সঙ্গে আছেন আপনি। প্রথম ধারাভাষ্যকার, প্রথম আন্তর্জাতিক নারী আম্পায়ার। ছেলেদের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে এই পথচলা কতটা কঠিন ছিল?
জেসি: 
আম্পায়ারিং জিনিসটা কঠিন। ছেলে-মেয়ে উভয়ের জন্য খুবই কঠিন। বাংলাদেশে মেয়েদের জন্য চ্যালেঞ্জ একটু বেশি। কারণ আমাদের আগে কেউ সেভাবে আম্পায়ারিং করেনি। এককথায় দেশের মানুষ নারী আম্পায়ার দেখে অভ্যস্ত ছিল না। ছেলেদের ম্যাচ পরিচালনা করে আম্পায়ারিং শিখতে হয়েছে। বয়সভিত্তিক দলের খেলা, ঢাকা লিগে তৃতীয় বিভাগ, দ্বিতীয় বিভাগ ও প্রথম বিভাগে ম্যাচ করেছি। ছেলেদের কাছ থেকে প্রথম দিকে অনেক সহযোগিতা পেয়েছি। সহকর্মীরা সর্বাত্মক সহযোগিতা করেছেন। যদিও দলগুলো প্রথম দিকে একটু অন্য চোখে দেখত। সবাই তো একরকম নয়। এখন গ্রহণযোগ্যতা বেড়েছে। 

 

সমকাল: ক্রিকেট খেলে আপনার অনেক খ্যাতি হয়েছে। বৈশ্বিক পরিচিতি দিচ্ছে আম্পায়ারিং। সেদিক থেকে নিজেকে কি একজন সফল নারী মনে করেন?
জেসি:
 অবশ্যই। ক্রিকেট না খেললে এই জায়গায় আসতে পারতাম না। ক্রিকেট খেলে পরিচিতি ও সম্মান পেয়েছি। ক্রিকেট না খেললে ওই সম্মান পাওয়া হতো না। আমাকে মানুষ চিনত না। ক্রিকেট খেলা একটা স্বপ্ন ছিল। এখন মেয়েরা হয়তো বলবে প্রতিষ্ঠা পাওয়ার জন্য ক্রিকেট খেলছে। আমরা তা বলতে পারতাম না। আমাদের প্রাপ্তি ছিল দেশের হয়ে খেলা। আমরা চিন্তা করেছি যেভাবে হোক ক্রিকেট খেলতে হবে। আর তখন ক্রিকেট খেলেছি বলে আজ আন্তর্জাতিক আম্পায়ার ও ধারাভাষ্যকার হতে পেরেছি। একজীবনে ক্রিকেট থেকে অনেক প্রাপ্তি আছে।

 

সমকাল: ক্যারিয়ারে কখনও বৈষম্যের শিকার হয়েছেন?
জেসি:
 সত্যি কথা বলতে সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশে নারী ক্রিকেটাররা এখনও অনেকটা পিছিয়ে। ভারতে ছেলেদের কাছাকাছি সুবিধা দেওয়া হয় মেয়েদের। আইপিএলে মেয়েদেরকে বিস্ময়কর সম্মানী দেওয়া হয়। বিশ্বের বেশির ভাগ দেশেই ছেলেদের সঙ্গে মেয়েদের ক্রিকেটে সুযোগ-সুবিধার ব্যবধান ঘুচে চলেও বাংলাদেশে পার্থক্যটা অনেক। মেয়েরা বিশ্বকাপে ভালো ক্রিকেট খেলায় ব্যবধান কিছুটা কমেছে। বেতন বেড়েছে, দৈনিক ভাতা ছেলেদের সমান করা হয়েছে। আমি বিশ্বাস করি সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ভালো রেজাল্ট করে মেয়েরা নিজেদের অধিকার আদায় করে নেবে। আমাদের সময়ে এই বৈষম্য ছিল শতভাগ।

 

সমকাল: মেয়েরা কি খেলাটাকে এখন সম্পূর্ণ পেশা হিসেবে নিতে পারে?
জেসি: 
অবশ্যই নিতে পারে। সব পেশাতে চ্যালেঞ্জ থাকে। চেষ্টা ও যোগ্যতা দিয়ে সেগুলো উতরে যেতে হয়। ক্রিকেটেও ছেলে-মেয়ে সবাইকে সংগ্রাম করতে হয়। কারণ যে মেয়ে ক্রিকেট শুরু করছে, সে জানে না কত দূর যেতে পারবে। জাতীয় দলে খেলতে পারবে কিনা। এই অনিশ্চয়তাকে জয় করতে পারাই হলো পেশাদারিত্ব। দেশের নারী ক্রিকেট যেখানে উন্নীত হয়েছে জাতীয় দলে খেলতে পারলে ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল। আমি বলব, মেয়েদের ক্রিকেট এখন অনেক ভালো একটি পেশা।

 

সমকাল: ক্রিকেটের পরিবেশ মেয়েদের জন্য কতটা নিরাপদ?
জেসি:
 পরিবেশ একটু একটু করে ভালোর হচ্ছে। মেয়েরা সব পেশাতেই হয়রানির শিকার হয়। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে এগিয়ে যেতে হবে। এশিয়ায় মেয়েরা একটু বেশি হয়রানির শিকার। এজন্য মেয়েদের অনেক সাহসী ও সোচ্চার হতে হবে। নারীরা সাহসী হলে নারীরা নারীদের পাশে পেলে হয়রানির মতো সমস্যা কমে যাবে। আমি বলছি না শূন্যের কোটায় নেমে যাবে। মেয়েদের এখন অনেক কিছু শেখানো হয়। পরিবার থেকে বলে দেওয়া হয় অপ্রীতিকর কিছু ঘটলে প্রতিবাদ করার জন্য। আমরা সাহসী না হলে প্রতিবাদী না করলে সমস্যা কমবে না। আমি মনে করি প্রতিটি নারীর সাহসী এবং সোচ্চার হলে অন্যায়কারী ভয় পাবে।

 

সমকাল: বিসিবি থেকে সচেতনতামূলক শিক্ষা কতটা দেওয়া হয়?
জেসি: 
সব ধরনের হয়রানির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে মেয়েদের কর্মশালা করে বিসিবি। আমি আমার মেয়েকে শেখাই কোনটি ভালো স্পর্শ, কোনটি খারাপ। তাকে প্রতিনিয়ত বলে দেওয়া হয় কোনো কিছু খারাপ মনে হলে সে যেন আমাদের জানায়। সমাজ এখন অনেক সচেতন। আমাদের হয়রানিকে ট্যাবু হিসেবে দেখা হতো। বাবা-মা কথা বলত না। এখন ছেলে-মেয়েদের সঙ্গে বাবা-মাকে ঘনিষ্ঠ হতে হবে, যাতে সমস্যাগুলো খুলে বলতে পারে।

 

সমকাল: আগে তো খেলোয়াড় মেয়েদেরকে ছেলের বউ করতে চাইত না পরিবারগুলো। সেই পরিস্থিতির কতটা উন্নতি হয়েছে?
জেসি: 
এই সমস্যা একেবারে শেষ হয়ে যায়নি। আগে মানুষ মনে করত আমার বউমা ক্রিকেট খেলবে, ফুটবল খেলবে বিষয়টি লজ্জার। এখন দেখছি অনেকে গর্ব করে– আমার স্ত্রী বা ছেলের বউ জাতীয় দলে ক্রিকেট খেলে। মেয়েরা ক্রিকেট খেলে আর্থিকভাবে সচ্ছল হচ্ছে। এই আর্থিক নিশ্চয়তা থেকে ক্রিকেটার বা ফুটবলার মেয়েকে ছেলের বউ করতে চায়। ছেলেরা খেলোয়াড় মেয়ে বিয়ে করতে চায়।

 

সমকাল: রাষ্ট্রের অস্থির সময়ে নারী ক্রীড়াবিদদের কী ধরনের সমস্যায় পড়তে হয়?
জেসি: 
আমরা এখন পর্যন্ত তেমন কোনো সমস্যার মুখোমুখি হইনি, তবে সমস্যা হয়। খেলাধুলা একটা ছন্দে চলে, সেখানে বাধা এলে পিছিয়ে পড়ে। বাংলাদেশে কিছু সমস্যা মেনে নিয়ে খেলাধুলা করতে হয়। কারণ মেয়েদের খেলাধুলা পছন্দ করে না– এমন মানুষও তো সমাজে আছে। তবে তারা সংখ্যায় কম। এ কারণে রাষ্ট্রে কোনো পরিবর্তন হলেও মেয়েদের খেলাধুলা বন্ধ হয় না। 

 

সমকাল: গত দুই দশকে মেয়েদের খেলাধুলায় কী ধরনের উন্নতি দেখতে পান?
জেসি: 
অনেক উন্নতি হয়েছে। মেয়ে ক্রিকেটাররা খুব ভালো খেলছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে মেয়েদের সাফল্য ছেলেদের থেকে বেশি। ফুটবলে মেয়েরা একেকজন তারকা। ছেলে ফুটবলাররা যা করতে পারেনি, মেয়েরা তা করে দেখিয়েছে। একটা সময়ে ছেলে ফুটবলার ও ছেলে ক্রিকেটারদের কথা চিন্তা করা হতো। এখন ফুটবলে মেয়েদের পরিচিতি ও সম্মান বেশি। ঋতুপর্ণা চাকমা, আফঈদাদের কে না চেনে। ক্রিকেটে মারুফা আক্তার বিশ্বজুড়ে পরিচিত। এই পরিচিতি নির্ভর করে ভালো খেলার ওপর। আমরা নিজেদের প্রমাণ করে এই জায়গায় উন্নীত হয়েছি।