আগুনের বৃষ্টি ও বাংকারে বন্দি জীবন: মধ্যপ্রাচ্যে ধ্বংসযজ্ঞের এক সপ্তাহ

  প্রিন্ট করুন   প্রকাশকালঃ ০৭ মার্চ ২০২৬ ০১:৩৯ অপরাহ্ণ   |   ৩৮ বার পঠিত
আগুনের বৃষ্টি ও বাংকারে বন্দি জীবন: মধ্যপ্রাচ্যে ধ্বংসযজ্ঞের এক সপ্তাহ

২০২৬ সালের ৭ মার্চ। মধ্যপ্রাচ্যের আকাশ আজ কেবল আগুনের গোলক আর ক্ষেপণাস্ত্রের গর্জনে প্রকম্পিত নয়, বরং এটি এক ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় ও অনিশ্চিত যুদ্ধের চূড়ান্ত সন্ধিক্ষণ। শুক্রবার মধ্যরাত থেকে শুরু হওয়া ইরানের নজিরবিহীন ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা ইসরায়েলকে এক অবরুদ্ধ জনপদে পরিণত করেছে। 

 

অন্যদিকে, তেহরানের প্রধান বিমানবন্দরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ভয়াবহ বোমাবর্ষণ ইরানকে এক বিধ্বস্ত জনপদে রূপ দিচ্ছে। পৃথিবী আজ থমকে দাঁড়িয়ে দেখছে মধ্যপ্রাচ্যের এক ভয়ংকর রূপ। গত এক সপ্তাহ ধরে চলা এই পাল্টাপাল্টি হামলায় আজ শনিবার সকাল পর্যন্ত পরিস্থিতি এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে শান্তি শব্দটির কোনো অস্তিত্ব নেই। ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে কাঁপছে ইসরায়েল, আর মার্কিন ইসরায়েলি বিমান হামলায় জ্বলছে তেহরান।

 

গতকাল শুক্রবার মধ্যরাত থেকে আজ শনিবার সকাল পর্যন্ত ইরান ইসরায়েলের দিকে অন্তত পাঁচটি শক্তিশালী ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে। এই হামলার তীব্রতা এতই বেশি ছিল যে সারা রাত তেল আবিব, জেরুজালেমসহ প্রধান শহরগুলোর লাখ লাখ মানুষকে মাটির নিচের নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্র বা বাংকারে রাত কাটাতে হয়েছে। 

 

ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, ইরান এখন মনস্তাত্ত্বিক ও ক্লান্তির কৌশল গ্রহণ করেছে। তারা একবারে সব ক্ষেপণাস্ত্র না ছুড়ে বিরতি দিয়ে দিয়ে হামলা চালাচ্ছে, যাতে ইসরায়েলিরা দীর্ঘ সময় বাংকারে থাকতে বাধ্য হয় এবং স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ও অর্থনীতি পুরোপুরি স্থবির হয়ে পড়ে। যদিও ইসরায়েলি সেনাবাহিনী দাবি করছে যে ইরান এক সপ্তাহে ১০০০ ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ার পরিকল্পনা করলেও মাত্র ২০০টি ছুড়তে পেরেছে, যা তাদের দুর্বলতা প্রকাশ করে, তবে সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক আকাশছোঁয়া।

 

ইরান যখন ইসরায়েলে ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ছে, ঠিক তখনই ইরানের প্রধান অভ্যন্তরীণ বিমানবন্দর মেহরাবাদে নেমে এসেছে ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞ। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিমান হামলায় বিমানবন্দরটির একাংশ এখন জ্বলন্ত ধ্বংসস্তূপ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা গেছে যে বিমানবন্দরের রানওয়েতে থাকা বেশ কয়েকটি উড়োজাহাজ দাউ দাউ করে জ্বলছে এবং কালো ধোঁয়ার কুণ্ডলীতে তেহরানের আকাশ ঢেকে গেছে। 

 

ইসরায়েলের দাবি যে তারা গত ৪ মার্চের হামলার ধারাবাহিকতায় আজ আবারও মেহরাবাদে হামলা চালিয়েছে তাদের হেলিকপ্টার নির্মাণ কারখানা এবং অত্যাধুনিক রাডার ব্যবস্থা ধ্বংস করতে। এর ফলে ইরানের অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ ব্যবস্থা এখন পুরোপুরি ভেঙে পড়ার মুখে।

 

যুদ্ধের আগুন এখন আর কেবল ইসরায়েল বা ইরানে সীমাবদ্ধ নেই। আজ শনিবার সকালে সংযুক্ত আরব আমিরাতের বাণিজ্যিক কেন্দ্র দুবাই এবং বাহরাইনের রাজধানী মানামায় বিকট বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। মানামায় বিস্ফোরণের পর মুহূর্তেই বিমান হামলার সাইরেন বেজে ওঠে এবং বাহরাইন সরকার তার নাগরিকদের দ্রুত নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। 

 

 

জর্ডানের আকাবা শহরের আকাশেও একটি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার খবর পাওয়া গেছে। এই ঘটনাগুলো প্রমাণ করে যে পুরো পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চল এখন যুদ্ধের প্রত্যক্ষ ক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে।

 

এই সংঘাতের আগুনে ঘি ঢালছে পরাশক্তিগুলোর অবস্থান। আজ শনিবার মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর ইসরায়েলের কাছে ১৫ কোটি ১৮ লাখ ডলারের জরুরি অস্ত্র বিক্রির অনুমোদন দিয়েছে। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও জানিয়েছেন যে মিত্রের নিরাপত্তা রক্ষায় তারা বিএলইউ ১১০এ বি বোমা এবং লজিস্টিক সহায়তা দিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর বক্তব্য এসেছে মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্টের কাছ থেকে। 

 

তিনি ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে পূর্বাভাস দিয়েছেন যে আজ রাতে ইরানের ওপর আমেরিকার বৃহত্তম বোমাবর্ষণ কর্মসূচি পরিচালিত হবে। বেসেন্টের মতে, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির সব কারখানা ও উৎক্ষেপণ কেন্দ্র আজ রাতের মধ্যে অকার্যকর করে দেওয়া হবে। এর পাশাপাশি তিনি ইরানের ওপর কঠোর অর্থনৈতিক বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির পরিকল্পনাও প্রকাশ করেছেন।
 

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের ব্যাপারে কোনো নমনীয়তা দেখাচ্ছেন না। তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন যে ইরানের সেনাবাহিনী ধ্বংস করতে যুক্তরাষ্ট্র অসাধারণ কাজ করছে। এমনকি গত সপ্তাহে নিহত ৬ মার্কিন সেনার মরদেহ গ্রহণ অনুষ্ঠানে উপস্থিত থেকে তিনি তাঁর কঠোর মনোভাব পুনর্ব্যক্ত করবেন। 

 

এদিকে, ওয়াশিংটন পোস্ট এর এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে যে রাশিয়া ইরানকে মার্কিন ও ইসরায়েলি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালাতে গোপন গোয়েন্দা তথ্য দিয়ে সহায়তা করছে। যদিও মার্কিন প্রতিরক্ষা সচিব হেগসেথ দাবি করেছেন যে কে কার সঙ্গে কথা বলছে তার সবকিছুই ট্রাম্প জানেন এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিচ্ছেন।
 

রেড ক্রিসেন্টের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত কয়েক দিনের হামলায় ইরানে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ১,৩৩২ জনে দাঁড়িয়েছে। ৩৬০০ এর বেশি বেসামরিক স্থাপনা ধ্বংস হয়ে গেছে। লেবাননেও ইসরায়েলি হামলায় নিহতের সংখ্যা ১২৩ ছাড়িয়েছে। লেবাননে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষীদের ওপর হামলা হওয়ায় আয়ারল্যান্ডসহ ইউরোপের দেশগুলো তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে। 

 

অন্যদিকে, ইরাকের বসরায় মার্কিন কোম্পানিতে ড্রোন হামলার ফলে বিশাল অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে। কুয়েত ও জর্ডান সীমান্তেও অস্থিরতা বিরাজ করছে। সমুদ্রপথে ফ্রান্সের ৬০টি জাহাজ আটকা পড়ায় বৈশ্বিক সাপ্লাই চেইন বা সরবরাহ ব্যবস্থা বড় ধরণের হুমকির মুখে।

 

২০২৬ সালের ৭ মার্চের এই সকালটি পৃথিবীর মানুষের কাছে এক বিভীষিকা। একদিকে রাশিয়ার তথ্য সহায়তায় ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা, অন্যদিকে আমেরিকার সর্বাধুনিক মারণাস্ত্র দিয়ে তেহরান ধ্বংসের নীল নকশা, এই দুই শক্তির লড়াইয়ে পিষ্ট হচ্ছে সাধারণ মানুষ। 

 

ইসরায়েলের বাংকারে বন্দি শিশু বা তেহরানের বিমানবন্দরে পুড়ে যাওয়া বেসামরিক মানুষ, কারোরই এই যুদ্ধে কোনো স্বার্থ নেই, তবুও তাঁরাই সবচেয়ে বেশি মূল্য দিচ্ছেন। আজ রাতে আমেরিকার সেই বৃহত্তম বোমাবর্ষণ যদি সত্যিই ঘটে, তবে মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্র যে চিরতরে বদলে যাবে তা বলাই বাহুল্য। শান্তি এখন কেবল অভিধানের শব্দ, বাস্তবতায় কেবল বারুদের গন্ধ আর লাশের মিছিল।