জুলাই থেকে ধাপে ধাপে নতুন পে স্কেল বাস্তবায়নের পরিকল্পনা

  প্রিন্ট করুন   প্রকাশকালঃ ০৪ মে ২০২৬ ১১:২৪ পূর্বাহ্ণ   |   ৩৭ বার পঠিত
জুলাই থেকে ধাপে ধাপে নতুন পে স্কেল বাস্তবায়নের পরিকল্পনা

নিজস্ব প্রতিবেদক:


 

সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য প্রস্তাবিত নতুন পে স্কেল আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছর (জুলাই-জুন) থেকে ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করছে সরকার। এ লক্ষ্যে আসন্ন বাজেটে বেতন-ভাতা ও পেনশন খাতে প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকা অতিরিক্ত বরাদ্দ রাখার চিন্তাভাবনা চলছে। প্রথম ধাপে নতুন বেতন কাঠামোর মূল বেতনের প্রায় অর্ধেক বাস্তবায়নের সম্ভাবনা রয়েছে।
 

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, পরবর্তী দুই অর্থবছরে বাকি অর্ধেক মূল বেতন এবং বিভিন্ন ভাতা পর্যায়ক্রমে কার্যকর করা হতে পারে। পাশাপাশি, পুরো কাঠামো দুই বছরেই বাস্তবায়নের একটি বিকল্প পরিকল্পনাও বিবেচনায় রয়েছে। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এবং অর্থ মন্ত্রণালয়বিষয়ক প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা রাশেদ আহমেদ তিতুমীরের সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে এ পরিকল্পনা প্রণয়ন করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদন মিললে আগামী অর্থবছর থেকেই বাস্তবায়ন শুরু হতে পারে।
 

অর্থ বিভাগের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, গত ২১ এপ্রিল জাতীয় বেতন কমিশন, জুডিশিয়াল সার্ভিস পে কমিশন এবং সশস্ত্র বাহিনী বেতন কমিশনের সুপারিশ পর্যালোচনায় গঠিত কমিটিকে পুনর্গঠন করা হয়। সম্প্রতি কমিটি তাদের মতামত জমা দিয়েছে। আর্থিক চাপ বিবেচনায় নবম পে স্কেল একাধিক ধাপে বাস্তবায়নের সুপারিশ করা হয়েছে। একই ধরনের সুপারিশ দিয়েছিল বেতন কমিশনও।
 

এর আগে সাবেক অর্থ সচিব জাকির আহমেদ খানের নেতৃত্বে গঠিত ‘জাতীয় বেতন কমিশন-২০২৫’ গত ২২ জানুয়ারি তাদের প্রতিবেদন জমা দেয়। এতে সরকারি কর্মচারীদের বেতন-ভাতা ১০০ থেকে ১৪০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়। সুপারিশ অনুযায়ী, সর্বনিম্ন বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকায় উন্নীত করার কথা বলা হয়েছে। পুরো প্রস্তাব বাস্তবায়নে অতিরিক্ত প্রায় ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন হতে পারে।
 

বর্তমানে প্রায় ১৪ লাখ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী ও ৯ লাখ পেনশনভোগীর জন্য বছরে সরকারের ব্যয় প্রায় ১ লাখ ৩১ হাজার কোটি টাকা।
 

বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) মহাপরিচালক ও কমিশনের সদস্য ড. এ কে এনামুল হক বলেন, একসঙ্গে নতুন পে স্কেল বাস্তবায়ন করলে মূল্যস্ফীতির ওপর চাপ বাড়তে পারে। তাই ধাপে ধাপে বাস্তবায়নই বাস্তবসম্মত। কমিশনও তিন বছরে পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়নের সুপারিশ করেছে।
 

তিনি আরও বলেন, বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে কিছু চ্যালেঞ্জ থাকলেও কর আদায়ের দক্ষতা বাড়িয়ে সরকারের রাজস্ব বৃদ্ধি সম্ভব। জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৬ থেকে ৭ শতাংশের মধ্যে থাকলে নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নে বড় ধরনের সমস্যা হওয়ার কথা নয়।
 

ড. এনামুল হক জানান, নতুন পে স্কেলের লক্ষ্য শুধু বেতন বৃদ্ধি নয়; বরং সরকারি সেবার মানোন্নয়ন ও সুশাসন নিশ্চিত করা। কর্মচারীদের ন্যূনতম জীবনযাত্রার মান নিশ্চিত করা গেলে তাদের দক্ষতা ও স্বচ্ছতা বৃদ্ধি পাবে। পাশাপাশি মেধাবী কর্মকর্তাদের সরকারি চাকরিতে ধরে রাখতেও উচ্চ পদে বেতন ও সুযোগ-সুবিধা পুনর্বিন্যাসের প্রস্তাব করা হয়েছে।
 

কমিশনের প্রতিবেদনে স্বাস্থ্য বীমা চালু, পেনশন ব্যবস্থার সংস্কার, সরকারি কর্মচারী কল্যাণ বোর্ড পুনর্গঠন, ভাতা কাঠামো পর্যালোচনা এবং স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে মানবসম্পদ উন্নয়নের মতো সুপারিশ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এছাড়া ১১তম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীদের টিফিন ভাতা ২০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ হাজার টাকা এবং বৈশাখী ভাতা ২০ শতাংশ থেকে ৫০ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে।
 

পেনশনভোগীদের ক্ষেত্রেও উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি প্রস্তাব করা হয়েছে। মাসে ২০ হাজার টাকার কম পেনশনপ্রাপ্তদের জন্য প্রায় ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি, ২০ থেকে ৪০ হাজার টাকার ক্ষেত্রে ৭৫ শতাংশ এবং ৪০ হাজার টাকার বেশি পেনশনপ্রাপ্তদের জন্য ৫৫ শতাংশ বৃদ্ধির সুপারিশ রয়েছে।
 

অন্যদিকে, সরকারের পরিচালন ব্যয় ক্রমেই বাড়ছে। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে মোট ব্যয় হয়েছে ২ লাখ ৫৮ হাজার ১৮৬ কোটি টাকা, যার মধ্যে ৮৫ শতাংশের বেশি ব্যয় হয়েছে পরিচালন খাতে। বেতন-ভাতা, পেনশন, ভর্তুকি ও ঋণের সুদ পরিশোধেই ব্যয়ের বড় অংশ যাচ্ছে।
 

গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে রাজস্ব আয়ের তুলনায় পরিচালন ব্যয় প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকা বেশি হওয়ায় সরকারকে ঋণের ওপর নির্ভর করতে হয়েছে।
 

বিশ্লেষকদের মতে, অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি বাড়ানো এবং রাজস্ব আহরণ জোরদার করা গেলে নতুন পে স্কেল বাস্তবায়ন সহজ হবে। বর্তমানে ২০১৫ সালের পে স্কেল অনুযায়ী সরকারি কর্মচারীরা বেতন পাচ্ছেন। নতুন কাঠামো কার্যকর হলে আয়করদাতার সংখ্যা বাড়ার সম্ভাবনাও রয়েছে।
 

উল্লেখ্য, অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর মহার্ঘ ভাতা নিয়ে আলোচনা শুরু হলেও তা স্থগিত করা হয়। তবে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য ইতোমধ্যে ১০ থেকে ১৫ শতাংশ বিশেষ সুবিধা চালু রয়েছে এবং বার্ষিক ৫ শতাংশ ইনক্রিমেন্ট বহাল আছে।