তুমি কি পাগল হয়ে গেছো? আজ সবাই তোমাকে ঘৃণা করে

  প্রিন্ট করুন   প্রকাশকালঃ ০২ জুন ২০২৬ ০৩:৩৪ অপরাহ্ণ   |   ৫৪ বার পঠিত
তুমি কি পাগল হয়ে গেছো? আজ সবাই তোমাকে ঘৃণা করে

লেবাননে ইসরায়েলি সামরিক অভিযানের তীব্রতা বৃদ্ধি এবং বৈরুতে বিমান হামলার পরিকল্পনাকে কেন্দ্র করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর মধ্যে এক নজিরবিহীন উত্তপ্ত ও কড়া ফোনালাপের ঘটনা ঘটেছে। 

 

মার্কিন সংবাদমাধ্যম 'অ্যাক্সিওস' -এর একটি বিশেষ প্রতিবেদনে এই বিস্ফোরক তথ্য ফাঁসের পর বিশ্ব রাজনীতিতে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, লেবানন পরিস্থিতি নিয়ে ক্ষুব্ধ ট্রাম্প ফোনালাপে নেতানিয়াহুকে তীব্র ভাষায় আক্রমণ করে বলেন, তুমি কি সম্পূর্ণ পাগল হয়ে গেছো? আমি না থাকলে তুমি আজ জেলে থাকতে। 

 

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ বন্ধে ইরানের সঙ্গে আমেরিকার যে গোপন ও সংবেদনশীল শান্তি আলোচনা চলছে, ইসরায়েলের এই আগ্রাসী পদক্ষেপ তা প্রায় ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিয়েছে বলে মার্কিন প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।

 

গত এপ্রিলের মাঝামাঝি সময় থেকে ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহর মধ্যে একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তি কার্যকর থাকলেও, সাম্প্রতিক দিনগুলোতে ইসরায়েলি বিমান হামলা ও দক্ষিণ লেবাননে স্থল অভিযানের পরিধি বাড়ায় তেল আবিব। ইসরায়েল এটিকে 'আত্মরক্ষা' হিসেবে দাবি করলেও, এর ফলে বিপুল সংখ্যক লেবাননি বেসামরিক নাগরিক নিহত হন। 

 

পরিস্থিতি আরও জটিল হয় যখন ইসরায়েল লেবাননের রাজধানী বৈরুতের দক্ষিণ শহরতলি তথা হিজবুল্লাহর শক্তিশালী ঘাঁটি লক্ষ্য করে বড় ধরনের বিমান হামলা এবং একটি পূর্ণাঙ্গ সামরিক অভিযানের চূড়ান্ত প্রস্তুতি নেয়।

 

ইসরায়েলের এই আকস্মিক ও ব্যাপক আগ্রাসনের প্রতিক্রিয়ায় ইরান আমেরিকার সঙ্গে চলমান শান্তি আলোচনা ও কূটনৈতিক রফাদফা স্থগিত করার হুমকি দেয়। তেহরানের স্পষ্ট শর্ত ছিল, আমেরিকার সঙ্গে যেকোনো চুক্তির অংশ হিসেবে লেবাননে ইসরায়েলি হামলা সম্পূর্ণ বন্ধ করতে হবে। ইরান আলোচনা থেকে সরে যাওয়ার ইঙ্গিত দিতেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হন এবং সরাসরি নেতানিয়াহুকে ফোন করেন।

 

মার্কিন প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তা এবং এই ফোনালাপের বিষয়ে অবগত একাধিক সূত্রের বরাত দিয়ে 'অ্যাক্সিওস' জানায়, ট্রাম্প নেতানিয়াহুর ওপর এতটাই ক্ষিপ্ত ছিলেন যে তিনি একের পর এক অশ্রাব্য ও চরম অপমানজনক শব্দ ব্যবহার করেন।

 

নেতানিয়াহুর উদ্দেশ্যে ট্রাম্প বলেন, তুমি কি পুরোপুরি পাগল হয়ে গেছো? আমি যদি পাশে না থাকতাম, তবে তোমার দুর্নীতির মামলায় তুমি আজ কারাগারে পচতে। আমি তোমার পিঠ বাঁচাচ্ছি, আর তুমি অকৃতজ্ঞের মতো আচরণ করছো। তোমার এই কর্মকাণ্ডের কারণে আজ গোটা বিশ্ব তোমাকে ঘৃণা করে। সবাই এখন ইসরায়েলকে ঘৃণা করছে।

 

সূত্রমতে, আলাপের একপর্যায়ে ট্রাম্প চরম উত্তেজিত হয়ে চিৎকার করে ওঠেন এবং বলেন, তুমি আসলে কী করতে চাইছো? ট্রাম্প স্বীকার করেন যে হিজবুল্লাহ ইসরায়েলে রকেট ছুড়ছে এবং ইসরায়েলের আত্মরক্ষার অধিকার রয়েছে; কিন্তু সাম্প্রতিক দিনগুলোতে নেতানিয়াহু যেভাবে অসামঞ্জস্যপূর্ণভাবে যুদ্ধ পরিস্থিতিকে উস্কে দিচ্ছেন, তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। 

 

বিশেষ করে মাত্র একজন হিজবুল্লাহ কমান্ডারকে হত্যার জন্য ইসরায়েল যেভাবে আস্ত বহুতল ভবন ধসিয়ে দিচ্ছে এবং নির্বিচারে বেসামরিক মানুষ মারছে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট তার তীব্র বিরোধিতা করেন। ট্রাম্প সতর্ক করে দেন যে, বৈরুতে বোমাবর্ষণ করলে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ইসরায়েল সম্পূর্ণ একঘরে ও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে।

 

অ্যাক্সিওসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ট্রাম্পের এই চরম উগ্র রূপ এবং কড়া নির্দেশের সামনে নেতানিয়াহু কার্যত নতি স্বীকার করতে বাধ্য হন। মার্কিন চাপ এতটাই জোরালো ছিল যে, ফোনালাপের পরপরই ইসরায়েলের এক শীর্ষ কর্মকর্তা নিশ্চিত করেন, তেল আবিব বৈরুতে হিজবুল্লাহর লক্ষ্যবস্তুতে বড় ধরনের হামলা চালানোর পরিকল্পনা সাময়িকভাবে বাতিল করেছে। 

 

ফোনালাপের পর ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর নিজস্ব সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম 'ট্রুথ সোশ্যাল' -এ দেওয়া একটি পোস্টে এই আলোচনাকে বেশ ফলপ্রসূ হিসেবে চিত্রিত করার চেষ্টা করেন।

 

তিনি লেখেন, আজ আমি বিবি (নেতানিয়াহু)-র সঙ্গে কথা বলেছি এবং তাঁকে লেবাননের বৈরুতে বড় ধরনের অভিযান না চালানোর অনুরোধ করেছি। সে তার সেনা ফিরিয়ে নিয়েছে। ধন্যবাদ বিবি!

 

একই সঙ্গে ট্রাম্প আরও দাবি করেন যে, তিনি মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে হিজবুল্লাহর শীর্ষ নেতৃত্বের প্রতিনিধিদের সঙ্গেও কথা বলেছেন। হিজবুল্লাহ ইসরায়েল ও তার সৈন্যদের লক্ষ্য করে হামলা বন্ধ করতে সম্মত হয়েছে এবং বিনিময়ে ইসরায়েলও তাদের ওপর আক্রমণ করবে না। ট্রাম্প তাঁর স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে যোগ করেন, দেখা যাক এই শান্তি কতদিন স্থায়ী হয়- আশা করি এটি চিরকাল স্থায়ী হবে!

 

ট্রাম্প পরিস্থিতি শান্ত হওয়ার দাবি করলেও, ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু নিজ দেশে রাজনৈতিক চাপ সামাল দিতে এই ফোনালাপকে কিছুটা ভিন্নভাবে উপস্থাপন করেছেন। ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে জারি করা বিবৃতিতে বিষয়টিকে ট্রাম্পের 'অনুরোধ বা নিষেধাজ্ঞা' হিসেবে না দেখিয়ে বরং হিজবুল্লাহর প্রতি একটি 'হুঁশিয়ারি' হিসেবে দেখানো হয়।

 

নেতানিয়াহু বলেন, তিনি ট্রাম্পকে স্পষ্ট জানিয়েছেন যে হিজবুল্লাহ যদি ইসরায়েলের শহরগুলোতে রকেট ও ড্রোন হামলা বন্ধ না করে, তবে ইসরায়েল বৈরুতে সন্ত্রাসী লক্ষ্যবস্তুগুলোতে আঘাত করতে দ্বিধাবোধ করবে না। এই অবস্থান অপরিবর্তিত থাকবে। একই সঙ্গে দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর  পূর্বপরিকল্পিত সামরিক অভিযান এবং ২৬ বছরের মধ্যে সবচেয়ে গভীর অনুপ্রবেশের প্রক্রিয়া জারি থাকবে বলে তিনি জানান।

 

এদিকে, লেবানন সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও-র একটি শান্তি প্রস্তাব হিজবুল্লাহর কাছে পাঠানো হয়েছিল, যাতে বলা হয়েছে ইসরায়েল বৈরুতের শহরতলিতে হামলা চালাবে না এবং বিনিময়ে হিজবুল্লাহও উত্তর ইসরায়েলে আক্রমণ বন্ধ রাখবে। লেবানন কর্তৃপক্ষ এই প্রস্তাবে হিজবুল্লাহর সম্মতি আদায় করতে পেরেছে।

 

ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর মধ্যকার সম্পর্ক কয়েক দশক পুরনো এবং অত্যন্ত জটিল। অতীতে জনসমক্ষে তাঁদের গভীর মিত্রতা দেখা গেলেও, পর্দার আড়ালে সবসময়ই এক ধরনের তীব্র মনস্তাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক উত্তেজনা বিরাজ করত। গত বছর ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে হোয়াইট হাউসে ফিরে আসার পর থেকে এটিই ছিল দুই নেতার মধ্যে হওয়া সবচেয়ে কঠিন এবং তিক্ত ফোনালাপ।

 

মার্কিন বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের মূল লক্ষ্য ইরানের সঙ্গে একটি ঐতিহাসিক ও স্থায়ী চুক্তি সম্পাদন করা, যা তাঁর দ্বিতীয় মেয়াদের সবচেয়ে বড় কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবে গণ্য হবে। কিন্তু নেতানিয়াহুর নিজস্ব রাজনৈতিক অস্তিত্ব ও যুদ্ধ টিকিয়ে রাখার কৌশল ট্রাম্পের সেই মহাপরিকল্পনার পথে মূল অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। 

 

ট্রাম্প যেভাবে নেতানিয়াহুকে কার্যত 'ওভাররুল' বা তাঁর সিদ্ধান্ত বাতিল করে দিলেন, তা আগামী দিনে ওয়াশিংটন-তেল আবিব সম্পর্কের সমীকরণকে কোন দিকে নিয়ে যায়, এখন সেটিই দেখার বিষয়।