হজ পালনকালে মিনায় জামারায় শয়তানকে পাথর নিক্ষেপের সময় অতীতে বহুবার হুড়োহুড়ি ও পদদলনের ঘটনায় প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। এমনই এক মর্মান্তিক অভিজ্ঞতা থেকে বাংলাদেশি প্রকৌশলী মোহাম্মদ ইব্রাহিমের উদ্ভাবিত পরিকল্পনা পরে সৌদি আরবে বাস্তবায়িত হয়ে হাজিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
জানা যায়, ১৯৯৪ সালে হজ পালন করতে গিয়ে জামারায় পাথর নিক্ষেপের সময় পদদলিত হয়ে প্রায় ২৭০ হাজির মৃত্যুর ঘটনা প্রত্যক্ষ করেন প্রকৌশলী ইব্রাহিম। এ ঘটনায় তিনি গভীরভাবে ব্যথিত হন এবং দেশে ফিরে এ সমস্যার স্থায়ী সমাধানে একটি বিজ্ঞানসম্মত পরিকল্পনা প্রণয়ন করেন। পরবর্তীতে তিনি পরিকল্পনাটি বাংলাদেশের পররাষ্ট্র ও ধর্ম মন্ত্রণালয়ে জমা দেন। সেখান থেকে ঢাকায় সৌদি দূতাবাসের মাধ্যমে বিষয়টি সৌদি সরকারের নজরে আসে এবং তা বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়।
হজের আনুষ্ঠানিকতায় মিনায় অবস্থানকালে হাজিদের তিনটি জামারায় পাথর নিক্ষেপ করতে হয়—জামরাতুল আকাবা (বড় শয়তান), জামরাতুল উস্তা (মাঝারি শয়তান) এবং জামরাতুল উলা (ছোট শয়তান)। পূর্বে নির্দিষ্ট কোনো দিকনির্দেশনা না থাকায় হাজিরা যেদিক দিয়ে পারতেন সেদিক দিয়েই পাথর নিক্ষেপ করতেন, ফলে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়ে দুর্ঘটনা ঘটত।
প্রকৌশলী ইব্রাহিমের প্রস্তাবিত পরিকল্পনায় চারটি মূল ধাপ ছিল। এর মধ্যে রয়েছে—জামারাগুলোকে বেড়া দিয়ে সংযুক্ত করে পৃথক প্রবেশ ও বের হওয়ার পথ তৈরি, জামারার দেয়াল সম্প্রসারণ করে জায়গা প্রশস্ত করা, একমুখী চলাচল নিশ্চিত করতে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা চালু করা এবং হাজিদের জন্য সুস্পষ্ট নির্দেশনামূলক সাইনবোর্ড স্থাপন। এই পরিকল্পনার ফলে জনস্রোত একমুখী হয়ে দুর্ঘটনার ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসে।
প্রকল্পটি বাস্তবায়নে সন্তুষ্ট হয়ে তৎকালীন সৌদি বাদশাহ ফাহাদ প্রকৌশলী ইব্রাহিমকে ‘মুহিব্বুল খায়ের’ উপাধিতে ভূষিত করেন এবং তাঁকে পবিত্র মক্কায় প্রকল্পপ্রধান হিসেবে কাজ করার সুযোগ দেন। কাবা শরিফের তৎকালীন প্রধান ইমাম শায়খ আবদুস সুবাইলও তাঁর প্রশংসা করে বলেন, বিশ্বসেরা প্রকৌশলীদের একজন ছিলেন ইব্রাহিম।
১৯৪১ সালে চাঁপাইনবাবগঞ্জে জন্মগ্রহণ করা মোহাম্মদ ইব্রাহিম বুয়েট ও পরে রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়ন করেন। জাপান থেকে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের পর তিনি শিক্ষা বিভাগ, বিআরটিসি, ওয়াপদা ও বিসিআইসিতে দায়িত্ব পালন করেন এবং বিসিআইসির প্রধান প্রকৌশলী হিসেবে অবসর নেন।
লেখালেখিতেও সক্রিয় ছিলেন তিনি। তাঁর রচিত ‘হাউ টু বিল্ড এ নাইস হোম’সহ একাধিক বই বিভিন্ন প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ানো হয়। এছাড়া ধর্মীয় ও প্রযুক্তি বিষয়ক আরও বেশ কয়েকটি গ্রন্থ রচনা করেন তিনি। নিজ এলাকায় শিক্ষা প্রসারে প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলাসহ বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ডেও যুক্ত ছিলেন এই প্রকৌশলী।
২০১৭ সালের ৮ জুলাই তিনি মৃত্যুবরণ করেন। জীবদ্দশায় তিনি জানান, মিনায় সম্প্রসারিত প্রকল্প এলাকার পাশের সড়কে তাঁর নাম সংবলিত স্মারক সংরক্ষিত রয়েছে—যা তাঁর অবদানের স্বীকৃতি বহন করে।