ইসরায়েলি বিমান হামলায় বিধ্বস্ত জনপদ, বাড়ছে যুদ্ধের আশঙ্কা

  প্রিন্ট করুন   প্রকাশকালঃ ১২ এপ্রিল ২০২৬ ০৪:২৩ অপরাহ্ণ   |   ৪৪ বার পঠিত
ইসরায়েলি বিমান হামলায় বিধ্বস্ত জনপদ, বাড়ছে যুদ্ধের আশঙ্কা

মধ্যপ্রাচ্যের আকাশ এখন বারুদের গন্ধে ভারী। একদিকে ইসলামাবাদে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যেকার শান্তি আলোচনা কোনো চুক্তি ছাড়াই ভেস্তে গেছে, অন্যদিকে লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে ইসরায়েলি বিমান বাহিনীর হামলা এক ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। 

আল জাজিরার মাঠপর্যায়ের সংবাদদাতাদের তথ্যমতে, দক্ষিণ লেবাননের একের পর এক শহর এখন ইসরায়েলি যুদ্ধবিমানের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে। গত কয়েক ঘণ্টায় ইসরায়েলি বিমান বাহিনী দক্ষিণ লেবাননের কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ বেশ কয়েকটি শহরে প্রচণ্ড হামলা চালিয়েছে। এর মধ্যে বিন্ট জাবিল এবং সিদ্দিকিন শহরের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। 

প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, হামলার তীব্রতা এতটাই বেশি ছিল যে কয়েক কিলোমিটার দূর থেকেও আগুনের লেলিহান শিখা দেখা গেছে। এর আগে টায়ার জেলার হানিয়া এবং শাইতিয়া শহরেও বিমান হামলা চালানো হয়। ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর দাবি, তারা হিজবুল্লাহর রকেট লঞ্চার এবং সামরিক অবকাঠামো লক্ষ্য করে এই হামলাগুলো চালাচ্ছে। তবে স্থানীয় সূত্রগুলো জানাচ্ছে, জনবহুল এই শহরগুলোতে হামলার ফলে ব্যাপক বেসামরিক ক্ষয়ক্ষতি ও সাধারণ মানুষের ঘরবাড়ি ধ্বংস হচ্ছে।

লেবাননে এই হামলার তীব্রতা এমন এক সময়ে বাড়ল যখন পাকিস্তান থেকে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এবং ইরানি প্রতিনিধি দল কোনো সমাধান ছাড়াই ফিরে গেছেন। ওয়াশিংটনের দেওয়া চূড়ান্ত প্রস্তাব তেহরান প্রত্যাখ্যান করার পরপরই মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন ফ্রন্টে উত্তেজনা নতুন মাত্রা পেয়েছে। 

বিশ্লেষকদের মতে, কূটনৈতিক পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ার অর্থ হলো এখন শক্তির প্রদর্শনই হবে প্রধান ভাষা। ইসরায়েল হয়তো মনে করছে যে, আলোচনার ব্যর্থতা তাদের জন্য হিজবুল্লাহ এবং ইরানের অন্যান্য প্রক্সি গোষ্ঠীগুলোর ওপর আরও কঠোর আঘাত হানার সুযোগ করে দিয়েছে।

বিন্ট জাবিল শহরটি ঐতিহাসিকভাবেই হিজবুল্লাহর একটি শক্তিশালী ঘাঁটি এবং প্রতিরোধের প্রতীক হিসেবে পরিচিত। ২০০৬ সালের যুদ্ধের সময় এই শহরটি কেন্দ্র করেই দীর্ঘস্থায়ী লড়াই হয়েছিল। বর্তমান দফায় ইসরায়েল এই শহরটিকে লক্ষ্যবস্তু করার অর্থ হলো তারা হিজবুল্লাহর সরবরাহ ব্যবস্থাকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন করে দিতে চায়। 

সিদ্দিকিন এবং হানিয়াতে চালানো হামলাগুলো মূলত লেবাননের সীমান্ত সংলগ্ন এলাকা থেকে ইসরায়েলের উত্তরাঞ্চলে রকেট হামলা ঠেকানোর একটি কৌশলগত প্রচেষ্টা। তেহরান থেকে আমাদের প্রতিনিধি তৌহিদ আসাদি জানিয়েছেন যে, ইরানি জনগণের মধ্যে এই সামরিক সংঘাত নিয়ে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। 

একদিকে দেশের ভেতরে অর্থনৈতিক সংকট, অন্যদিকে আঞ্চলিক মিত্রদের ওপর ইসরায়েলি হামলা, সব মিলিয়ে ইরান এক কঠিন পরিস্থিতির সম্মুখীন। হিজবুল্লাহ ইতিমধ্যেই বৈরুতে বিশাল বিক্ষোভ সমাবেশ করে ঘোষণা করেছে যে, তারা ইসরায়েলি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে শেষ পর্যন্ত লড়াই করবে।

লেবাননের সাধারণ মানুষ এখন ভিটেমাটি ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে রাজধানী বৈরুতের দিকে ছুটছে। কিন্তু সেখানেও বিমান হামলার আতঙ্ক কাটছে না। হাসপাতালগুলোতে আহত মানুষের ভিড় বাড়ছে এবং জরুরি চিকিৎসা সরঞ্জামের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। জাতিসংঘ এবং বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা বারবার যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানালেও মাঠপর্যায়ে তার কোনো প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। 

মার্কিন প্রশাসন শান্তি আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার জন্য ইরানকে দায়ী করে এখন ইসরায়েলের সামরিক পদক্ষেপের প্রতি পরোক্ষ সমর্থন দিচ্ছে বলে মনে করছেন অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষক। আগামী সপ্তাহে ওয়াশিংটনে ইসরায়েল ও লেবাননের মধ্যে একটি পৃথক আলোচনার কথা থাকলেও, বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই আলোচনার ভবিষ্যৎ নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্নচিহ্ন দেখা দিয়েছে। যখন বোমা বর্ষণ চলছে, তখন আলোচনার টেবিলে বসা কতটা ফলপ্রসূ হবে, তা নিয়ে সন্দিহান বিশ্বনেতারা।

ইসরায়েলি বিমান হামলার পরিধি যদি আরও উত্তর দিকে অর্থাৎ লিতানি নদীর ওপারে বিস্তৃত হয়, তবে এটি একটি পূর্ণাঙ্গ আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নিতে পারে। হিজবুল্লাহর হাতে থাকা দূরপাল্লার মিসাইলগুলো যদি ইসরায়েলের তেল আবিব বা হাইফার মতো শহরগুলোতে আঘাত হানে, তবে মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্র বদলে যাওয়ার মতো পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে। 

দক্ষিণ লেবাননের হানিয়া থেকে বিন্ট জাবিল, প্রতিটি জনপদ এখন ধ্বংসস্তূপে পরিণত হচ্ছে। শান্তি আলোচনার যে আশার আলো ইসলামাবাদে জ্বলেছিল, তা এখন লেবাননের আকাশে ইসরায়েলি যুদ্ধবিমানের গর্জনে তলিয়ে গেছে। বিশ্ববাসী এখন এক গভীর অনিশ্চয়তার দিকে তাকিয়ে আছে, যেখানে কূটনীতি পরাজিত হয়েছে এবং কামানের গোলা কথা বলছে। 

মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি এখন কেবল একটি শব্দমাত্র, যার বাস্তব রূপায়ণ দিন দিন আরও কঠিন হয়ে পড়ছে। যদি দ্রুত কোনো কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়া হয়, তবে এই সংঘাত কেবল লেবানন বা ইসরায়েলের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং পুরো বিশ্ব অর্থনীতি ও ভূ-রাজনীতিকে এক অন্ধকার গহ্বরে নিমজ্জিত করবে। তথ্যসূত্র: আল জাজিরা