দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা ইরান-যুক্তরাষ্ট্র স্নায়ুযুদ্ধ এবার সরাসরি সংঘাতে রূপ নিয়েছে। গত বৃহস্পতিবার গভীর রাতে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিতে দুই দেশের নৌবাহিনীর মধ্যে ভয়াবহ গোলাগুলির ঘটনা ঘটেছে।
তবে এই সংঘাতকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অত্যন্ত হালকাভাবে ব্যাখ্যা করে একে ‘লাভ ট্যাপ’ বা ‘ভালোবাসার টোকা’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। ট্রাম্পের এমন মন্তব্যে একদিকে যেমন বিশ্বজুড়ে বিস্ময় সৃষ্টি হয়েছে, অন্যদিকে যুদ্ধের আশঙ্কা আরও ঘনীভূত হয়েছে।
সংঘাতের সূত্রপাত- কার দাবি কী : গত বৃহস্পতিবার রাতের ওই গোলাগুলির ঘটনায় কারা প্রথম উসকানি দিয়েছে, তা নিয়ে ওয়াশিংটন এবং তেহরান পরস্পরবিরোধী দাবি করছে। যুক্তরাষ্ট্রের ভাষ্য: মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড জানিয়েছে, তাদের গাইডেড-মিসাইল ডেস্ট্রয়ার যখন হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করছিল, তখন ইরানি বাহিনী কোনো প্ররোচনা ছাড়াই ড্রোন, ক্ষেপণাস্ত্র এবং দ্রুতগামী ছোট নৌকা দিয়ে হামলা চালায়।
এর জবাবে মার্কিন বাহিনী ‘আত্মরক্ষামূলক’ হামলা চালায়। ইরানের ভাষ্য: ইরানের সামরিক কমান্ড অভিযোগ করেছে, যুক্তরাষ্ট্র আগে তাদের একটি তেলবাহী ট্যাংকার এবং বেসামরিক জাহাজকে লক্ষ্যবস্তু করেছে। এছাড়া ইরানের উপকূলীয় বন্দর খামির, সিরিক এবং কেশম দ্বীপে আকাশপথে হামলা চালিয়েছে মার্কিন বিমানবাহিনী।
ট্রাম্পের ‘লাভ ট্যাপ’ ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তোলপাড় : হামলার পরপরই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার নিজস্ব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’ এবং ব্রডকাস্ট মিডিয়ায় একাধিক মন্তব্য করেন। তার বক্তব্যের মূল পয়েন্টগুলো হলো- ভালোবাসার টোকা: ট্রাম্প ইরানি লক্ষ্যবস্তুতে মার্কিন হামলাকে ‘লাভ ট্যাপ’ বলে বর্ণনা করেন।
তিনি বলেন, ইরান আমাদের সঙ্গে ছিনিমিনি খেলেছে, আর আমরা তাদের স্রেফ উড়িয়ে দিয়েছি। প্রজাপতির মতো পতন: ট্রাম্পের কাব্যিক কিন্তু আক্রমণাত্মক বর্ণনা ছিল এমন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের একাধিক ছোট নৌকা ধ্বংস করেছে, সেগুলো খুব সুন্দরভাবে সমুদ্রে তলিয়ে গেছে, যেন একটি প্রজাপতি তার কবরে আছড়ে পড়ছে।
যুদ্ধবিরতি বহাল: এত বড় সংঘাতের পরও ট্রাম্প দাবি করছেন, দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান যুদ্ধবিরতি এখনো কার্যকর আছে। তবে তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, যদি ইরান শান্তিচুক্তিতে স্বাক্ষর না করে, তবে ভবিষ্যতে আরও ‘সহিংস’ আঘাত করা হবে।
মাঠপর্যায়ের ক্ষয়ক্ষতি ও বর্তমান পরিস্থিতি : ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম আইআরএনএ জানিয়েছে, মার্কিন হামলায় তাদের উপকূলীয় স্থাপনাগুলোর ক্ষতি হয়েছে। অন্যদিকে, ইরান দাবি করেছে তারা মার্কিন নৌবাহিনীর জাহাজে বড় ধরনের আঘাত হানতে সক্ষম হয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে তাদের কোনো জাহাজের বড় ক্ষয়ক্ষতির খবর নিশ্চিত করা হয়নি।
সংশ্লিষ্ট পক্ষ প্রধান অস্ত্র/কৌশল ক্ষয়ক্ষতির দাবি : যুক্তরাষ্ট্র গাইডেড-মিসাইল ডেস্ট্রয়ার, বিমান হামলা, একাধিক ইরানি নৌকা ও উপকূলীয় স্থাপনা ধ্বংস। ইরান কামিকাজে ড্রোন, অ্যান্টি-শিপ মিসাইল মার্কিন জাহাজের উল্লেখযোগ্য ক্ষতিসাধন।
বিশ্ব নেতাদের উদ্বেগ ও বিশ্লেষকদের মত : বিশ্লেষকরা বলছেন, ট্রাম্পের এই ‘লাভ ট্যাপ’ তত্ত্ব আসলে ইরানের ওপর মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টির একটি কৌশল। তবে যুদ্ধবিরতি চলাকালীন এমন বড় আকারের গোলাগুলি আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী সরাসরি যুদ্ধবিরতির লঙ্ঘন। জাবির বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্প একদিকে বলছেন আলোচনা ভালো চলছে, অন্যদিকে আক্রমণাত্মক ভাষা ব্যবহার করছেন। এই দ্বিচারিতা মধ্যপ্রাচ্যে তেলের বাজারে অস্থিরতা তৈরি করতে পারে এবং বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধাক্কা দিতে পারে।
সর্বোপরি, ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তারা যুক্তরাষ্ট্রের দেয়া শান্তিচুক্তি বা প্রস্তাবটি বিবেচনা করছে। কিন্তু বৃহস্পতিবার রাতের এই ঘটনা সেই প্রক্রিয়াকে দীর্ঘায়িত করতে পারে। ট্রাম্পের ভাষায় এটি ‘ভালোবাসার টোকা’ হলেও, ইরানি জনগণের কাছে এটি তাদের সার্বভৌমত্বের ওপর সরাসরি আঘাত। হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশ্বের এক-পঞ্চমাংশ তেল সরবরাহ হয়। তাই এখানে অস্থিরতা মানেই বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সংকট।
পারস্য উপসাগরের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) দাবি করেছে, তাদের সামরিক অভিযানের মুখে মার্কিন নৌবাহিনীর তিনটি ডেস্ট্রয়ার এলাকা ছাড়তে বাধ্য হয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্র এ দাবি অস্বীকার করে জানিয়েছে, ইরানের হামলা প্রতিহত করা হয়েছে এবং মার্কিন যুদ্ধজাহাজের কোনো ক্ষতি হয়নি।
গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় হরমুজ প্রণালিতে এই উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। ইরানি রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের বরাতে জানা যায়, জাস্ক বন্দরের কাছে একটি ইরানি তেলবাহী ট্যাংকারে মার্কিন হামলার জবাবে আইআরজিসি পাল্টা সামরিক অভিযান চালায়। ইরানের দাবি, বারবার সতর্ক করার পরও মার্কিন ডেস্ট্রয়ারগুলো হরমুজের দিকে অগ্রসর হওয়ায় তারা হামলা চালাতে বাধ্য হয়।
আইআরজিসির ভাষ্য অনুযায়ী, অভিযানে জাহাজ বিধ্বংসী ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, ক্রুজ মিসাইল এবং বিস্ফোরকবাহী ড্রোন ব্যবহার করা হয়। ইরান দাবি করেছে, হামলায় মার্কিন নৌবাহিনীর বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে এবং যুদ্ধজাহাজগুলো দ্রুত এলাকা ত্যাগ করে।
তবে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) সম্পূর্ণ ভিন্ন তথ্য দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, ইরান থেকে ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন ও ছোট নৌযানের হামলা প্রতিহত করা হয়েছে এবং কোনো মার্কিন জাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও বলেছেন, ‘আমাদের জাহাজের কোনো ক্ষতি হয়নি, বরং হামলাকারীদের ব্যাপক ক্ষতি করা হয়েছে।’
মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, হামলার জবাবে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের কয়েকটি সামরিক স্থাপনায় পাল্টা হামলা চালিয়েছে। এর মধ্যে ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ কেন্দ্র, ড্রোন ঘাঁটি এবং সামরিক কমান্ড সেন্টারও ছিল বলে দাবি করা হয়েছে।
এদিকে ইরানের খাতাম আল-আম্বিয়া কেন্দ্রীয় সদর দপ্তরের মুখপাত্র ইব্রাহিম জোলফাগারি যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকাণ্ডকে সামুদ্রিক দস্যুতা হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি সতর্ক করে বলেন, ইরানের বিরুদ্ধে যে কোনো আগ্রাসনের জবাব কঠোরভাবে দেয়া হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিতে এ ধরনের সামরিক উত্তেজনা বৈশ্বিক বাজারে বড় প্রভাব ফেলতে পারে। বিশ্বের উল্লেখযোগ্য পরিমাণ তেল এই নৌপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। ফলে এখানে সংঘাত বেড়ে গেলে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার, সামুদ্রিক নিরাপত্তা এবং মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে নতুন সংকট তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এর আগেও গত কয়েক দিনে হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে পাল্টাপাল্টি দাবি, হুমকি এবং সামরিক তৎপরতা দেখা গেছে। উভয় পক্ষই নিজেদের অবস্থানকে আত্মরক্ষামূলক বলে দাবি করলেও পরিস্থিতি এখনো অত্যন্ত উত্তেজনাপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে।