ঢাকার অদূরে কেরানীগঞ্জের এক তরুণীর ভয়াবহ অভিজ্ঞতার মাধ্যমে দুবাইভিত্তিক বাংলাদেশি নারী পাচার চক্রের নতুন তথ্য সামনে এসেছে। পাচারকারীদের নির্যাতনের শিকার ওই তরুণী, যিনি নিরাপত্তার স্বার্থে ‘রুপালি’ (ছদ্মনাম) নামে পরিচিত, জানিয়েছেন— একই চক্রের হাতে বর্তমানে দুবাইয়ে জিম্মি অবস্থায় রয়েছেন অন্তত ১৪ বাংলাদেশি নারী। তাদের উদ্ধারে আন্তর্জাতিক পুলিশ সংস্থা ইন্টারপোলের সহায়তা নিতে যাচ্ছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)।
তিন বছর দুবাইয়ে কাটিয়ে দেশে ফিরে আসা রুপালি বলেন, “প্রতিদিন রাত ৮টার দিকে মাইক্রোবাস এসে আমাদের ডান্স ক্লাবে নিয়ে যেত। ভোর পর্যন্ত সেখানে থাকতে হতো। গ্রাহকদের খুশি করতে না পারলে নির্যাতনের শিকার হতে হতো। ঘুমাতে দেওয়া হতো না। অনেক মেয়েই কান্নাকাটি করত। আমি চাই না, এমন জায়গায় শত্রুকেও যেতে হোক।”
সিআইডি সূত্র জানায়, গত ১৪ মে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে রুপালিকে উদ্ধার করা হয়। এ সময় মানব পাচারকারী চক্রের সদস্য আব্দুল হান্নানকে গ্রেপ্তার করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, পাওনা বেতন ও পাসপোর্ট ফেরতের প্রলোভন দেখিয়ে রুপালিকে আবার দুবাইয়ে পাঠানোর চেষ্টা করা হচ্ছিল।
রুপালির ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ১৩ এপ্রিল মাসে ৫০ হাজার টাকা বেতনে রেস্তোরাঁয় চাকরির আশ্বাসে তাকে দুবাই নেওয়া হয়। কিন্তু সেখানে পৌঁছানোর পর তার পাসপোর্ট কেড়ে নেওয়া হয় এবং একটি বাসায় আটকে রাখা হয়। পরে জানতে পারেন, প্রতিশ্রুত চাকরি নয়, বরং ডান্স বারে কাজ করতেই তাকে সেখানে নেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, “আমি সবচেয়ে কম বয়সী ছিলাম। সবকিছু মেনে নেওয়া খুব কঠিন ছিল। পরিবারের কথা ভেবে চুপ ছিলাম।”
রুপালি জানান, পরিবারের আর্থিক সংকটের কারণেই বিদেশে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। পাসপোর্ট করতে গিয়ে নারায়ণগঞ্জের পারভেজ নামের এক ব্যক্তির সঙ্গে পরিচয় হয়। পরে তার মাধ্যমে কুমিল্লার আব্দুল হান্নানের সঙ্গে যোগাযোগ হয় এবং সেখান থেকেই শুরু হয় তার দুর্ভোগ।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, দুবাইয়ের ‘বৈশাখী হলি ডে বিচ ক্লাব’কে কেন্দ্র করেই এই পাচার চক্র পরিচালিত হতো। ক্লাবটির অন্যতম মালিক হিসেবে আব্দুল হান্নানের নাম এসেছে। তিনি অধিকাংশ সময় দুবাইয়ে অবস্থান করলেও মাঝেমধ্যে বাংলাদেশে আসতেন। তার ভাগনে ইমরানসহ আরও কয়েকজন ক্লাবটির কার্যক্রম দেখাশোনা করতেন।
রুপালি জানান, অনেক নারী নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে পালিয়ে যান। তবে পাসপোর্ট আটকে রাখা এবং বেতন না পাওয়ার কারণে তিনি পালানোর সাহস পাননি। পালানোর চেষ্টা করলে স্থানীয় পুলিশের হাতে আটক হয়ে কারাগারে যেতে হয়েছে অনেককে।
তিনি আরও বলেন, “মায়ের অসুস্থতা বা ঈদের সময় সামান্য কিছু টাকা দিত। পুরো বেতন চাইলে অন্য জায়গায় বিক্রি করে দেওয়ার ভয় দেখাত।”
চলতি বছরের ২২ ফেব্রুয়ারি দেশে ফেরার অনুমতি পান রুপালি। তবে শর্ত ছিল, ঢাকায় নেমেই পাসপোর্ট পাচারকারীদের সহযোগীর কাছে জমা দিতে হবে এবং কয়েক মাস পর আবার দুবাই ফিরে যেতে হবে।
রুপালির দাবি, তার পাওনা ছিল ১৮ লাখ টাকা। এর মধ্যে মাত্র দুই লাখ টাকা দেওয়া হয়। বাকি ১৬ লাখ টাকা ও পাসপোর্ট ফেরত না দিয়ে আবার দুবাই পাঠানোর চেষ্টা করা হচ্ছিল।
তিনি বলেন, “নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধে বিমানবন্দর পর্যন্ত যেতে বাধ্য হই। পরিবারের সঙ্গে খুব কম যোগাযোগ করতে দিত। ফোনে কী বলছি, সেটাও গোপনে রেকর্ড করা হতো।”
তদন্ত কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আব্দুল হান্নান আন্তর্জাতিক মানব পাচারকারী চক্রের সক্রিয় সদস্য। তার সহযোগীরা দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে অসচ্ছল ও কম বয়সী নারীদের টার্গেট করে বিদেশে উচ্চ বেতনের চাকরির প্রলোভন দেখাত।
এর আগে মানব পাচারের অভিযোগে র্যাবের হাতেও গ্রেপ্তার হয়েছিল হান্নান। সে সময় র্যাব জানায়, তার চক্রের মাধ্যমে ৭২৯ নারীকে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে পাঠানো হয়েছে। তাদের বেশিরভাগের বয়স ছিল ১৮ থেকে ২৫ বছরের মধ্যে। এই চক্রে অন্তত ৫০ জন এজেন্ট কাজ করত বলে তথ্য পেয়েছিল আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার (সিরিয়াস ক্রাইম) মোহাম্মদ বদরুল আলম মোল্লা বলেন, “এক তরুণীকে পাচার করা হচ্ছে— এমন তথ্য পাওয়ার পরই তাকে বিমানবন্দর থেকে উদ্ধার করা হয়। তদন্তে আরও অন্তত ১৪ বাংলাদেশি নারীকে দুবাইয়ে জিম্মি করে রাখার তথ্য মিলেছে। তাদের উদ্ধারে ইন্টারপোলের সহায়তা নেওয়া হবে।”
তিনি জানান, এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত দেশি-বিদেশি চক্রের সদস্যদের শনাক্তে তদন্ত চলছে।
বাংলাদেশ পুলিশ ও জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ থেকে প্রতিবছর নারী ও শিশুদের ভারত, পাকিস্তান, সিরিয়া, লেবানন, জর্ডান, লিবিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব, কুয়েত, ওমান, বাহরাইন, থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশে পাচার করা হচ্ছে।
সিআইডির তথ্য বলছে, মানব পাচার সংক্রান্ত মামলার সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। ২০২৫ সালে তদন্তাধীন মামলার সংখ্যা ছিল ১২২টি। ২০২৪ সালে ছিল ১০০টি, ২০২৩ সালে ৮৬টি এবং ২০২২ সালে ১১৪টি। গত পাঁচ বছরে মানব পাচারের অভিযোগে ৩৪৪ জনকে গ্রেপ্তার করেছে সিআইডি।
বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাকের সহযোগী পরিচালক শরিফুল হাসান বলেন, “এক দশকের বেশি সময় ধরে কাজের প্রলোভন দেখিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে বাংলাদেশি নারীদের ডান্স বার ও যৌনপল্লিতে বিক্রি করা হচ্ছে। বিশেষ করে দুবাইয়ে এ ধরনের ঘটনা বেশি। অনেক নারী ভয়াবহ নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন।”
ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের তথ্য অনুযায়ী, গত সাত বছরে অন্তত ৭০ হাজার নারী বিদেশ থেকে দেশে ফিরেছেন। তাদের অনেকে নির্যাতনের অভিযোগ করেছেন। একই সময়ে অন্তত ৮০০ নারীর মরদেহ দেশে এসেছে।
জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্য বলছে, বর্তমানে ১০ লাখের বেশি বাংলাদেশি নারী বিদেশে কাজ করছেন। তবে কতজন নির্যাতনের শিকার হয়ে দেশে ফিরেছেন, তার সুনির্দিষ্ট তথ্য নেই।
করোনা মহামারির সময় ২০২০ সালে ৪৯ হাজার ২২ জন নারী দেশে ফেরেন। বিমানবন্দর সূত্র অনুযায়ী, ২০১৯ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত কয়েক হাজার নারী বন্দি বা ডিপোর্টি হিসেবে দেশে ফিরে এসেছেন।
সূত্র: সমকাল