মার্কিন হামলা ও ইরানি জাহাজ জব্দ, অনিশ্চয়তার মুখে ইসলামাবাদ শান্তি বৈঠক

  প্রিন্ট করুন   প্রকাশকালঃ ২০ এপ্রিল ২০২৬ ০৭:০৪ অপরাহ্ণ   |   ৫৪ বার পঠিত
মার্কিন হামলা ও ইরানি জাহাজ জব্দ, অনিশ্চয়তার মুখে ইসলামাবাদ শান্তি বৈঠক

মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে যুদ্ধের ঘনঘটা আরও ঘনীভূত হয়েছে। গত দুই সপ্তাহের ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি শেষ হওয়ার মাত্র ৪৮ ঘণ্টা আগে মার্কিন নৌবাহিনী কর্তৃক ইরানের একটি কার্গো জাহাজ জব্দের ঘটনায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে।

এই ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় তেহরান সাফ জানিয়ে দিয়েছে যে, পাকিস্তানের ইসলামাবাদে প্রস্তাবিত শান্তি আলোচনায় বসার কোনো পরিকল্পনা তাদের বর্তমানে নেই।

প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আজ এক বিবৃতিতে নিশ্চিত করেছেন যে, মার্কিন নৌবাহিনী ইরানের একটি পতাকাবাহী কার্গো জাহাজ আটক করেছে। জাহাজটি মার্কিন নৌ-অবরোধ উপেক্ষা করে ইরানের একটি বন্দরে প্রবেশের চেষ্টা করছিল।

ট্রাম্পের ভাষ্যমতে, আমরা ওই জাহাজটিকে থামার জন্য বারবার সতর্কতা দিয়েছিলাম। কিন্তু তাদের ক্রুরা কোনো কথা শোনেনি। ফলে আমাদের নৌ-জাহাজ তাদের ইঞ্জিন রুমে গোলাবর্ষণ করে জাহাজটি অচল করে দেয় এবং নিয়ন্ত্রণে নেয়।

প্রকাশিত একটি ভিডিও ফুটেজে দেখা গেছে, মার্কিন বাহিনী আক্রমণ করার ঠিক আগ মুহূর্তে সতর্কবার্তা দিচ্ছে, আপনার ইঞ্জিন রুম খালি করুন, ইঞ্জিন রুম খালি করুন! আমরা আপনাদের জাহাজ অচল করে দেওয়ার জন্য গোলাবর্ষণ করতে প্রস্তুত।

ইরানের সামরিক বাহিনী এই আক্রমণকে ‘জলদস্যুতা‘হিসেবে অভিহিত করেছে এবং এর কড়া জবাব দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। ইরানি সংবাদমাধ্যমগুলো দাবি করেছে যে, তাদের ড্রোনগুলো পারস্য উপসাগরে অবস্থানরত মার্কিন যুদ্ধজাহাজগুলোকে লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে। যদিও পেন্টাগন জানিয়েছে, এই ড্রোন হামলায় এখন পর্যন্ত কোনো ক্ষয়ক্ষতি বা প্রাণহানির খবর পাওয়া যায়নি। তবে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এটি কেবল বড় কোনো ঝড়ের পূর্বাভাস।

এমন এক উত্তপ্ত পরিস্থিতির মধ্যেই মার্কিন ভাইস-প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের নেতৃত্বে একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল পাকিস্তানে পৌঁছেছে। সোমবার থেকে ইসলামাবাদে এই আলোচনা শুরু হওয়ার কথা ছিল। পাকিস্তানের রাজধানী জুড়ে "ইসলামাবাদ টকস" সংবলিত ব্যানার এবং যুক্তরাষ্ট্র, পাকিস্তান ও ইরানের পতাকা দেখা গেলেও আলোচনার টেবিলটি এখনও শূন্য।

ইরানি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র পরিষ্কার ভাষায় জানিয়েছেন, আমাদের পরবর্তী রাউন্ডের আলোচনায় অংশ নেওয়ার কোনো পরিকল্পনা নেই এবং এ বিষয়ে এখনও কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি।

গত দুই সপ্তাহ ধরে চলা সাময়িক যুদ্ধবিরতির মেয়াদ আগামী বুধবার (২২ এপ্রিল) শেষ হতে যাচ্ছে। যদি এর মধ্যে কোনো নতুন সমঝোতা না হয়, তবে ইরান ও ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার সংঘাত পূর্ণমাত্রার যুদ্ধে রূপ নিতে পারে। ফ্রাঙ্ক গার্ডনারের মতো আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, যদি শেষ মুহূর্তে ইরান আলোচনায় বসতেও রাজি হয়, তবুও বড় কোনো ব্রেক-থ্রু বা সফলতার সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ। কারণ, উভয় পক্ষই একে অপরের ওপর থেকে বিশ্বাস হারিয়ে ফেলেছে।

সমুদ্রের এই অস্থিরতা সরাসরি প্রভাব ফেলেছে বিশ্ব বাজারে। ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম ইতিমধ্যে ব্যারেল প্রতি ৯৬ ডলারে পৌঁছেছে। হরমুজ প্রণালী বন্ধ হয়ে যাওয়ার হুমকিতে এশিয়ার দেশগুলো, বিশেষ করে ভারত, চীন ও জাপান গভীর সংকটে পড়েছে। জ্বালানি সাশ্রয়ে বিভিন্ন দেশ ইতিমধ্যে কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করেছে।

এই সংঘাতের পেছনে কয়েকটি প্রধান অন্তরায় কাজ করছে। বিশ্বাসযোগ্যতার অভাব:ইরান মনে করছে, আলোচনার প্রস্তাব দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র আসলে তাদের ওপর সামরিক ও অর্থনৈতিক চাপ বাড়াচ্ছে। ট্রাম্প প্রশাসন স্পষ্ট করেছে যে, কোনো চুক্তি না হওয়া পর্যন্ত ইরানের ওপর নৌ-অবরোধ বজায় থাকবে, যা তেহরানের কাছে অগ্রহণযোগ্য।

ইসরায়েল ও অন্যান্য আঞ্চলিক শক্তির সক্রিয়তা এই সংকটকে আরও জটিল করে তুলছে। ২০২৬ সালের ২০ এপ্রিল বিশ্ব রাজনীতির ইতিহাসে একটি কালো দিন হিসেবে চিহ্নিত হতে পারে। একদিকে শান্তির জন্য পাকিস্তানে মার্কিন প্রতিনিধি দলের অপেক্ষা, অন্যদিকে সমুদ্রের বুকে যুদ্ধের ডামাডোল—এই দুই বিপরীতমুখী চিত্র প্রমাণ করে যে মধ্যপ্রাচ্য এক আগ্নেয়গিরির ওপর দাঁড়িয়ে আছে। বুধবারের ডেডলাইন শেষ হওয়ার আগে কূটনীতি জয়ী হয় নাকি রণহুংকার, তা দেখার অপেক্ষায় এখন পুরো বিশ্ব।