রাজধানীর এলিফ্যান্ট রোডস্থ “কসুরে হাদী খানকা শরীফ”-এ গতকাল এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি, অর্থনৈতিক সংকট, সামাজিক অস্থিরতা এবং বাংলাদেশের পররাষ্ট্র নীতি নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য দিয়েছেন খানকা শরীফের প্রতিষ্ঠাতা ও ইসলামী ব্যক্তিত্ব শায়খুল হাদী হযরত সৈয়দ আব্দুল হান্নান আল হাদী।
দীর্ঘ সময়ব্যাপী এ সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, বাংলাদেশ বর্তমানে এক জটিল সন্ধিক্ষণ অতিক্রম করছে। রাজনৈতিক পরিবর্তন, আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক চাপ, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং সামাজিক বিভাজন একসঙ্গে দেশের স্থিতিশীলতার ওপর প্রভাব ফেলছে। তাঁর মতে, “জাতীয় ঐক্য ও নৈতিক নেতৃত্ব ছাড়া এই সংকট থেকে উত্তরণ সম্ভব নয়।”
তিনি বলেন, গত কয়েক বছরে দেশের রাজনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। নির্বাচন-পরবর্তী নতুন বাস্তবতায় জনগণের প্রত্যাশা যেমন বেড়েছে, তেমনি বেড়েছে হতাশাও। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ২০২৬ সালের নির্বাচনের পর বাংলাদেশে নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরি হয়েছে এবং দেশের গণতান্ত্রিক কাঠামো নতুন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি।
সাক্ষাৎকারে শায়খুল হাদী বলেন, “ক্ষমতার পরিবর্তন হলেই মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন হয় না। রাষ্ট্র পরিচালনায় সততা, জবাবদিহিতা ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে না পারলে জনগণের আস্থা ফিরবে না।”
অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি সাধারণ মানুষের জীবনকে কঠিন করে তুলেছে। মধ্যবিত্ত ও নিম্ন আয়ের মানুষের ওপর চাপ ক্রমেই বাড়ছে। সম্প্রতি আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)-এর সঙ্গে বাংলাদেশের নতুন ঋণচুক্তি নিয়ে আলোচনাও দেশের অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জকে সামনে নিয়ে এসেছে।
পররাষ্ট্র নীতি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বাংলাদেশকে এখন অত্যন্ত সতর্ক ও ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি অনুসরণ করতে হবে। “আমরা কোনো শক্তির বলয়ে আবদ্ধ হতে চাই না। বাংলাদেশের স্বার্থই হতে হবে পররাষ্ট্রনীতির মূল ভিত্তি,” মন্তব্য করেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, বর্তমান বৈশ্বিক বাস্তবতায় বাংলাদেশকে একদিকে যেমন ভারত, চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখতে হবে, অন্যদিকে মুসলিম বিশ্বের সঙ্গেও সম্পর্ক আরও জোরদার করতে হবে। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরাও মনে করছেন, বাংলাদেশের নতুন সরকারকে এখন আঞ্চলিক শক্তিগুলোর মধ্যে সূক্ষ্ম কূটনৈতিক ভারসাম্য রক্ষা করতে হচ্ছে।
সামাজিক অবক্ষয় ও তরুণ সমাজের প্রসঙ্গে শায়খুল হাদী বলেন, “নৈতিক শিক্ষার অভাব এবং রাজনৈতিক বিভাজনের কারণে যুবসমাজের একটি অংশ হতাশ হয়ে পড়ছে। তাদের সঠিক দিকনির্দেশনা দেওয়া এখন রাষ্ট্র ও সমাজের দায়িত্ব।”
তিনি দেশের আলেম সমাজ, বুদ্ধিজীবী ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, “সংঘাত নয়, সংলাপের সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। অন্যথায় বিভক্তি আরও গভীর হবে।”
সাক্ষাৎকারের শেষদিকে তিনি দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, “বাংলাদেশ সম্ভাবনার দেশ। সঠিক নেতৃত্ব, সুশাসন ও নৈতিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠা করতে পারলে এই দেশ আবারও দক্ষিণ এশিয়ায় একটি শক্তিশালী রাষ্ট্র হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে।”