নিজস্ব প্রতিবেদক
রাজধানীর যানজট কমাতে প্রায় দুই দশক আগে নেওয়া চারটি আন্তঃজেলা বাস টার্মিনাল নগরের বাইরে স্থানান্তরের উদ্যোগ এখনো বাস্তবায়ন হয়নি। ২০০৭ সালে তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার গুলিস্তান-ফুলবাড়িয়া, সায়েদাবাদ, মহাখালী ও গাবতলী বাস টার্মিনাল সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা গ্রহণ করলেও দীর্ঘ ২০ বছরেও তা আলোর মুখ দেখেনি।
তবে সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান চার মাসের মধ্যে সায়েদাবাদ বাস টার্মিনাল কাঁচপুরে স্থানান্তরের নির্দেশ দেওয়ার পর ঢাকা দক্ষিণ ও উত্তর সিটি করপোরেশন এ বিষয়ে নতুন করে কার্যক্রম শুরু করেছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, অতীতে বিভিন্ন পর্যায়ে পরিকল্পনা গ্রহণ হলেও নানা কারণে তা বাস্তবায়িত হয়নি। বর্তমান দুই সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তারা এ ব্যর্থতার দায় আগের প্রশাসনের ওপর চাপিয়ে জানিয়েছেন, তারা দায়িত্ব নেওয়ার পর বিষয়টি এগিয়ে নিতে কাজ করছেন।
জানা গেছে, ২০০৭ সালে রাজধানীর যানজট কমাতে গাবতলী বাস টার্মিনাল আমিনবাজার বা সাভারের হেমায়েতপুরে, সায়েদাবাদ কাঁচপুরে, গুলিস্তান-ফুলবাড়িয়া কেরানীগঞ্জে এবং মহাখালী বাস টার্মিনাল টঙ্গী বা আশুলিয়া সড়কের পাশে স্থানান্তরের পরিকল্পনা করা হয়। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন মেয়রের আমলে সম্ভাব্য স্থান পরিদর্শন ও পরিকল্পনা প্রণয়ন হলেও দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি।
শেখ ফজলে নূর তাপস মেয়র থাকাকালে সায়েদাবাদ বাস টার্মিনাল স্থানান্তরের জন্য কাঁচপুরে প্রায় সাড়ে ১২ একর জমি অধিগ্রহণ করা হয়। টার্মিনাল নির্মাণের দরপত্র আহ্বানের প্রস্তুতিও নেওয়া হয়েছিল। তবে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর সেই প্রক্রিয়া থেমে যায়। বর্তমানে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার পর ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন কাঁচপুরে টার্মিনাল নির্মাণের কার্যক্রম দ্রুত এগিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে।
এদিকে গুলিস্তান-ফুলবাড়িয়া বাস টার্মিনাল স্থানান্তরের জন্যও নতুন পরিকল্পনা করছে ডিএসসিসি। সংস্থাটির পরিবহন বিভাগের একটি সূত্র জানায়, কেরানীগঞ্জের বাঘৈর এলাকায় প্রায় ৩৩ একর জমি চিহ্নিত করা হয়েছে। তবে জমি অধিগ্রহণের বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
ডিএসসিসির মহাব্যবস্থাপক (পরিবহন) কমডোর মাহবুবুর রহমান তালুকদার জানান, স্থায়ী টার্মিনাল নির্মাণের আগে কেরানীগঞ্জে পাসপোর্ট অফিসসংলগ্ন একটি ব্যক্তি মালিকানাধীন জায়গায় অস্থায়ীভাবে গুলিস্তান-ফুলবাড়িয়া বাস টার্মিনাল স্থানান্তরের পরিকল্পনা রয়েছে।
অন্যদিকে, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের একটি সূত্র জানায়, পূর্বাচলে একটি বাস ডিপো নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী মহাখালী টার্মিনালের বাসগুলো সেখানে অবস্থান করবে এবং নির্ধারিত সময়ে শুধু যাত্রী তুলতে মহাখালীতে আসবে। তবে গাবতলী বাস টার্মিনাল স্থানান্তরের জন্য আমিনবাজার, হেমায়েতপুর ও বিরুলিয়ার কয়েকটি স্থান পরিদর্শন করা হলেও এখনো কোনো স্থান চূড়ান্ত হয়নি।
রাজধানীর কারওয়ান বাজার স্থানান্তরের উদ্দেশ্যে এক দশক আগে মহাখালী বাস টার্মিনালের পাশে ৭ দশমিক ১৭ একর জমির ওপর ‘মহাখালী ডিএনসিসি মার্কেট’ নির্মাণ করা হয়েছিল। কিন্তু ব্যবসায়ীদের সেখানে স্থানান্তর করা সম্ভব হয়নি। পরে করোনা মহামারির সময় ভবনটিকে কোভিড ডেডিকেটেড হাসপাতালে রূপান্তর করা হয় এবং বর্তমানে সেখানে হাসপাতালের কার্যক্রম চলমান রয়েছে। ফলে কারওয়ান বাজার স্থানান্তরের পরিকল্পনা কার্যত পরিত্যক্ত হয়েছে।
নগর পরিকল্পনাবিদ ও ইনস্টিটিউট ফর প্লানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, রাজধানীর যানজটের জন্য শুধু বাস টার্মিনালকে দায়ী করা ঠিক হবে না। বরং সামগ্রিক পরিবহন ব্যবস্থার দুর্বলতা ও অব্যবস্থাপনা দূর করার দিকেই গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
তিনি আরও বলেন, বাস টার্মিনাল শহরের অনেক বাইরে সরিয়ে নেওয়া হলে যাত্রীদের অতিরিক্ত যাতায়াত ব্যয়, নিরাপত্তা ঝুঁকি এবং জনভোগান্তি বাড়তে পারে। বিশেষ করে স্বল্প আয়ের মানুষ, নারী, শিশু ও বয়স্কদের দুর্ভোগ আরও বৃদ্ধি পাবে। তার মতে, পরিকল্পিত পুনর্বিন্যাসের মাধ্যমে বিদ্যমান অবকাঠামো উন্নয়নই হতে পারে অধিক কার্যকর সমাধান।