সরকার ও দলের পৃথক সত্তা

  প্রিন্ট করুন   প্রকাশকালঃ ২৩ মে ২০২৬ ১০:৩৩ পূর্বাহ্ণ   |   ৪৯ বার পঠিত
সরকার ও দলের পৃথক সত্তা

দীর্ঘ ১৭ বছরের আন্দোলন-সংগ্রাম, মামলা-হামলা এবং কণ্টকাকীর্ণ পথ পেরিয়ে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) আজ রাষ্ট্রক্ষমতায়। ২৪-এর ঐতিহাসিক ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করেছে দলটি। তবে ক্ষমতার স্বাদ পাওয়ার পর অনেক রাজনৈতিক দলের ইতিহাসে দেখা গেছে, সরকার ও দল একীভূত হয়ে যাওয়ার ফলে তৃণমূলের সঙ্গে নেতৃত্বের দূরত্ব সৃষ্টি হয়। বিএনপি এবার সেই ফাঁদে পা দিতে নারাজ।

 

রাষ্ট্র পরিচালনা এবং দল পরিচালনা এই দুটি সত্তাকে সম্পূর্ণ আলাদা করে একটি সুশৃঙ্খল ও আধুনিক রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তোলার ‘মাস্টারপ্ল্যান’ নিয়ে এগোচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী ও দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান। ক্ষমতাসীন হওয়ার পর দলের ভেতরে ভারসাম্য রক্ষা করা যেকোনো বড় দলের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। বিএনপির নীতিনির্ধারকদের স্পষ্ট বার্তা হলো যারা সরকারে মন্ত্রী বা নীতিনির্ধারক হিসেবে দেশ পরিচালনার দায়িত্বে থাকবেন, তাদের মূল ফোকাস থাকবে রাষ্ট্র পরিচালনায়।

 

অন্যদিকে, দলের মূল সংগঠনের দায়িত্ব পালন করবেন নিবেদিতপ্রাণ ও পরীক্ষিত নেতাকর্মীরা। দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমানের এই দূরদর্শী পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে সরকার ও দলের মধ্যে একটি পেশাদার ও ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে উঠবে, যা দীর্ঘমেয়াদে দলের জনভিত্তি মজবুত করবে।

 

চলতি বছরের ডিসেম্বরে অনুষ্ঠি হবে বিএনপির সপ্তম জাতীয় কাউন্সিল। এটি কেবল কোনো আনুষ্ঠানিক আয়োজন নয়, বরং এটি বিএনপির ভবিষ্যৎ রাজনীতির গতিপথ নির্ধারণের এক যুগাত্বক টার্নিং পয়েন্ট। গত বছরের ৩০ ডিসেম্বর দলের চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার প্রয়াণের পর, তারেক রহমানের নেতৃত্বে এটিই হতে যাচ্ছে দলের প্রথম জাতীয় কাউন্সিল। এই কাউন্সিল ঘিরে তৃণমূলের প্রত্যাশা আকাশচুম্বী।

 

দীর্ঘ ১৭ বছর যারা রাজপথে রক্ত দিয়েছেন এবং দুঃসময়ে দলের ছায়া হয়ে ছিলেন, তাদেরকেই আগামী দিনের কাণ্ডারি হিসেবে দেখতে চায় কর্মীরা। বিশেষ করে ‘হাইব্রিড’ বা সুবিধাবাদী নেতাদের রুখে দিয়ে পরীক্ষিত নেতৃত্ব বাছাইয়ের ওপর জোর দেয়া হচ্ছে।

 

এবারের কাউন্সিলটি হতে যাচ্ছে বর্তমান মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের বিদায়ী মঞ্চ। ২০১১ সাল থেকে দীর্ঘ সময় ধরে যিনি দলের কঠিনতম সময়ে শক্ত হাতে হাল ধরেছিলেন, তিনি বয়সের ভার ও ক্লান্তির কথা স্বীকার করে অবসরের ইচ্ছার কথা জানিয়েছেন। ফলে, কাউন্সিলে একজন নতুন ও ডাইনামিক মহাসচিব বরণ করে নেয়ার অপেক্ষায় রয়েছে পুরো দল।

 

জাতীয় কাউন্সিলের আগেই দলের ভিত্তিমূল শক্ত করতে অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠন এবং ঢাকা মহানগর কমিটিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয়া হচ্ছে। সিটি করপোরেশন নির্বাচনকে সামনে রেখে ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ কমিটির পুনর্গঠন এখন সময়ের দাবি। দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা নজরুল ইসলাম খান জানিয়েছেন, খুব দ্রুতই ওয়ার্ড থেকে শুরু করে মহানগর পর্যায়ের কমিটিগুলো পূর্ণাঙ্গ করার কাজ শেষ করা হবে।

 

এ ছাড়া যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল এবং ছাত্রদলের মতো অঙ্গসংগঠনগুলোর মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটি ভেঙে নতুন নেতৃত্ব আনার কাজও চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। শোনা যাচ্ছে, চেয়ারম্যান তারেক রহমান ইতোমধ্যেই অঙ্গসংগঠনগুলোর নতুন খসড়া কমিটি প্রস্তুত করেছেন, যা যেকোনো সময় ঘোষিত হতে পারে। ফার্মগেটের কৃষিবিদ ইনস্টিটিউটে নেতাদের সঙ্গে সাম্প্রতিক এক রুদ্ধদ্বার সভায় তিনি তৃণমূলের মানুষের কাছে সরকারের উন্নয়ন পরিকল্পনা পৌঁছানো এবং সাংগঠনিক কর্মসূচি জোরদার করার সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা দিয়েছেন।

 

বিএনপির ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ১৯৯৩ সালের পর থেকে দলটির কাউন্সিলগুলো নানা বৈরী পরিবেশে অনুষ্ঠিত হয়েছে। ২০০৯ ও ২০১৬ সালের কাউন্সিলগুলো ছিল অনেকটা সাদামাটা এবং প্রতিকূল পরিস্থিতি মোকাবিলায় সীমাবদ্ধ। কিন্তু এবারের সপ্তম কাউন্সিল হতে যাচ্ছে এক বিশাল উৎসবের মঞ্চ। ১৭ বছরের সংগ্রামের পর ক্ষমতায় আসা একটি দলের কর্মী-সমর্থকদের মাঝে যে জয়ের আমেজ, তা এবারের কাউন্সিলকে করবে এক ঐতিহাসিক মাইলফলক।

 

সর্বোপরি, বিএনপির আজকের এই রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট কেবল ক্ষমতার মসনদে বসার গল্প নয়, বরং এটি একটি সুশৃঙ্খল ও আদর্শিক রাজনৈতিক দল হিসেবে গড়ে ওঠার নতুন লড়াই। সরকার ও দল এই দুই সত্তাকে পৃথক করে তারেক রহমান যে রাজনৈতিক মডেল প্রবর্তনের কথা ভাবছেন, তা সফল হলে বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক নতুন ধারা সূচিত হবে।

 

রাজপথের লড়াইয়ের চেয়ে রাষ্ট্র পরিচালনা অনেক বেশি দায়িত্ব ও কৌশলের বিষয়। সেই ভারসাম্য বজায় রেখেই বিএনপি যদি তৃণমূলের পরীক্ষিত নেতাদের মূল্যায়ন করতে পারে এবং দলের শৃঙ্খলা ধরে রাখতে পারে, তবে আগামী দিনে বিএনপি শুধু সরকার হিসেবে নয়, বরং একটি আদর্শিক রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান হিসেবেও দীর্ঘকাল টিকে থাকবে। ডিসেম্বরের কাউন্সিল থেকে উঠে আসা নতুন নেতৃত্বই ঠিক করবে আগামী দিনের বাংলাদেশ গড়তে বিএনপি কতটা কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারে।