বিবিসি
আফগানিস্তান-এর ঘোর প্রদেশ-এর রাজধানী চাঘচারানে ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গেই ধুলোমাখা এক শ্রমবাজারে ভিড় করছেন শত শত মানুষ। শীতার্ত পাহাড়ের নিচে দাঁড়িয়ে থাকা এসব মানুষের একমাত্র আশা—কোনোভাবে দিনের কাজ জুটবে, আর সেই আয় দিয়ে সন্তানদের জন্য অন্তত একবেলা খাবার নিশ্চিত করা যাবে।
তালেবান ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকে অর্থনৈতিক সংকট, আন্তর্জাতিক সহায়তা কমে যাওয়া এবং তীব্র খাদ্যসংকটে দেশটির সাধারণ মানুষের জীবন চরম দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। দারিদ্র্য ও ক্ষুধার চাপে বহু পরিবার টিকে থাকার শেষ প্রান্তে পৌঁছে গেছে। এমন পরিস্থিতিতে কোনো কোনো পরিবার সন্তানকে বিক্রি করার মতো ভয়াবহ সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হচ্ছে—যা স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছে।
৪৫ বছর বয়সী জুমা খান গত ছয় সপ্তাহে মাত্র তিন দিন কাজ পেয়েছেন। দৈনিক মজুরি হিসেবে তার আয় ১৫০ থেকে ২০০ আফগানি (প্রায় ২৫০–৩৫০ টাকা)। তিনি বলেন, টানা কয়েক রাত সন্তানদের না খেয়ে ঘুমাতে হয়েছে। ধার করে কোনোভাবে ময়দা জোগাড় করতে হয়। সন্তানদের অনাহারে মারা যাওয়ার আতঙ্কে প্রতিদিন বেঁচে থাকতে হয়।
তার মতো অসংখ্য মানুষের জীবন এখন এমনই অনিশ্চয়তার মধ্যে কাটছে। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, দেশটির প্রায় তিন-চতুর্থাংশ মানুষ ন্যূনতম মৌলিক চাহিদা পূরণ করতে পারছে না।
চাঘচারানের শ্রমবাজারে দাঁড়িয়ে থাকা রাবানি নামের এক ব্যক্তি জানান, সন্তানদের না খেয়ে থাকার খবর শুনে তিনি আত্মহত্যার কথাও ভেবেছিলেন। পরে সন্তানদের ভবিষ্যতের কথা ভেবে সেই সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসেন।
আরেক বৃদ্ধ খাজা আহমদ জানান, বয়সের কারণে কেউ তাকে কাজ দিতে চায় না। ফলে পরিবার চালানো তার জন্য দিন দিন অসম্ভব হয়ে পড়ছে।
চরম দারিদ্র্যের মধ্যে আব্দুল রশিদ আজিমি নামের এক ব্যক্তি জানান, তিনি তার সাত বছর বয়সী যমজ কন্যাসন্তানকে বিক্রি করে দেওয়ার কথাও ভাবছেন। ঋণ ও বেকারত্বের চাপে তিনি সম্পূর্ণ অসহায় হয়ে পড়েছেন।
অন্যদিকে সাঈদ আহমদ তার পাঁচ বছর বয়সী মেয়ের চিকিৎসার খরচ জোগাতে তাকে এক আত্মীয়ের কাছে বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছেন বলে জানান। মেয়েটির চিকিৎসার জন্য ২ লাখ আফগানি (প্রায় ৩,২০০ ডলার) নেওয়া হয়েছে এবং ভবিষ্যতে কিস্তিতে পুরো অর্থ পরিশোধের পর তাকে ফিরিয়ে নেওয়ার কথা রয়েছে। তিনি বলেন, পরিস্থিতি ভালো থাকলে তিনি কখনোই এমন সিদ্ধান্ত নিতেন না।
আগে পরিবারগুলো খাদ্য সহায়তা পেলেও আন্তর্জাতিক সহায়তা কমে যাওয়ার পর অনেক প্রোগ্রাম বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে খাদ্য, চিকিৎসা ও জরুরি সহায়তা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে অসংখ্য পরিবার। একই সঙ্গে খরা ও অর্থনৈতিক মন্দা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
চাঘচারানের প্রধান হাসপাতালে নবজাতক বিভাগে অতিরিক্ত রোগীর চাপ দেখা গেছে। একাধিক শিশুকে একই বেডে রাখতে হচ্ছে। অপুষ্টি ও চিকিৎসার অভাবে অনেক নবজাতকের অবস্থা সংকটাপন্ন।
চিকিৎসকেরা বলছেন, প্রতিদিন রোগীর সংখ্যা বাড়লেও প্রয়োজনীয় ওষুধ, যন্ত্রপাতি ও শয্যার অভাব রয়েছে। অনেক পরিবার চিকিৎসার খরচ বহন করতে না পেরে রোগী ফিরিয়ে নিয়ে যেতে বাধ্য হচ্ছে।
সব প্রতিকূলতা সত্ত্বেও চাঘচারানের শ্রমবাজারে মানুষগুলো প্রতিদিন আবারও ফিরে আসে—এই আশায় যে কোনোভাবে আরেকটি দিন পার করা যাবে, সন্তানদের মুখে অন্তত একটুকরো খাবার তুলে দেওয়া যাবে।