শিবচরে বিলুপ্তির পথে ঐতিহ্যবাহী বেতশিল্প, সংকটে শত বছরের কারিগরি ঐতিহ্য

  প্রিন্ট করুন   প্রকাশকালঃ ০৩ জুন ২০২৬ ০৫:২২ অপরাহ্ণ   |   ৫৬ বার পঠিত
শিবচরে বিলুপ্তির পথে ঐতিহ্যবাহী বেতশিল্প, সংকটে শত বছরের কারিগরি ঐতিহ্য

মোঃ আবুল খায়ের খান, স্টাফ রির্পোটার, শিবচর (মাদারীপুর):



একসময় গ্রামীণ জীবন, অর্থনীতি ও সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল বেতশিল্প। মাদারীপুরের শিবচর উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে বেতের তৈরি নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী উৎপাদনের মাধ্যমে শত শত পরিবার জীবিকা নির্বাহ করত। তবে আধুনিকতার প্রভাবে এখন সেই ঐতিহ্যবাহী শিল্প বিলুপ্তির পথে, হারিয়ে যেতে বসেছে গ্রামীণ অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।

 

১৮টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা নিয়ে গঠিত কৃষিনির্ভর শিবচর উপজেলা একসময় বেতশিল্পের জন্য বিশেষভাবে পরিচিত ছিল। পাঁচ্চর, আলেপুর, দত্তপাড়া, সন্ন্যাসীর চর, উমেদপুর, ভদ্রাসন এবং শিবচর পৌরসভাসহ আশপাশের গ্রামগুলোতে বছরের পর বছর ধরে বেতশিল্পের চর্চা চলে আসছিল। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত কারিগরদের ব্যস্ততায় মুখর থাকত কর্মশালা ও ঘরবাড়ি।
 

সেসময় বেত দিয়ে তৈরি হতো ওজন মাপার পালা, সের, খালই, ধামা, পালি, চেয়ার, মোড়া, ঝুড়ি, ডালা ও খাটসহ নানা ধরনের গৃহস্থালি সামগ্রী। স্থানীয় হাট-বাজারে এসব পণ্যের ব্যাপক চাহিদা ছিল। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে প্লাস্টিক, ফোম ও আধুনিক আসবাবপত্রের ব্যবহার বৃদ্ধি পাওয়ায় বেতপণ্যের বাজার সংকুচিত হয়ে পড়েছে।
 

স্থানীয় প্রবীণদের ভাষ্য, একসময় এলাকার শত শত পরিবার এই শিল্পের ওপর নির্ভরশীল ছিল। বর্তমানে সেই দৃশ্য প্রায় হারিয়ে গেছে। নতুন প্রজন্মের অনাগ্রহ, কাঁচামালের সংকট এবং পর্যাপ্ত পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে শিল্পটি টিকে থাকার লড়াই করছে।
 

আলেপুর গ্রামের অভিজ্ঞ বেতশিল্পী মো. আলমগীর হোসেন বলেন, “আগে সারাবছর কাজের চাপ সামলাতে পারতাম না। এখন মাসে এক-দুইটি অর্ডারও আসে না। কাঁচামালের দাম বেড়েছে, কিন্তু পণ্যের ন্যায্যমূল্য পাওয়া যায় না। ফলে অনেকেই বাধ্য হয়ে পেশা পরিবর্তন করেছেন।”
 

স্থানীয় শিক্ষক মো. কাজী শহিদ বলেন, “একসময় শিবচরের বেতশিল্প ছিল আমাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের গর্ব। বর্তমানে তরুণরা বিদেশমুখী হওয়ায় কেউ আর এই পেশায় আসতে আগ্রহী নয়। ফলে একটি মূল্যবান ঐতিহ্য ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে।”
 

স্থানীয়দের মতে, নদীভাঙন, কাঁচামালের সংকট, প্রশিক্ষণের অভাব, আধুনিক বাজার ব্যবস্থার সঙ্গে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়া এবং সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার ঘাটতি—সব মিলিয়ে বেতশিল্প আজ অস্তিত্ব সংকটে রয়েছে।
 

এ বিষয়ে শিবচর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এইচ. এম. ইবনে মিজান বলেন, “ঐতিহ্যবাহী শিল্প ও সংস্কৃতি সংরক্ষণে সরকার বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করছে। স্থানীয়ভাবে বেতশিল্পের উন্নয়ন এবং কারিগরদের সহায়তার বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে উপস্থাপন করা হবে।”
 

সংশ্লিষ্টদের মতে, সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে সহজ শর্তে ঋণ প্রদান, আধুনিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা, পণ্যের নকশাগত উন্নয়ন এবং বাজার সম্প্রসারণ নিশ্চিত করা গেলে শিবচরের ঐতিহ্যবাহী বেতশিল্প আবারও নতুন প্রাণ ফিরে পেতে পারে।