অর্থনৈতিক গণতন্ত্রায়নের পথে দেশ

  প্রিন্ট করুন   প্রকাশকালঃ ১৩ মে ২০২৬ ১১:৩৫ পূর্বাহ্ণ   |   ৩৮ বার পঠিত
অর্থনৈতিক গণতন্ত্রায়নের পথে দেশ

দেশের অর্থনীতিকে গুটিকয়েক প্রভাবশালী ‘অলিগার্ক’ বা অসাধু চক্রের কবজা থেকে মুক্ত করে সাধারণ মানুষের অংশীদারত্ব নিশ্চিত করতে ‘অর্থনীতির গণতন্ত্রায়ন’ কর্মসূচি হাতে নিয়েছে সরকার। ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশের অর্থনীতিকে ১ ট্রিলিয়ন (১০০০ বিলিয়ন) ডলারে উন্নীত করার উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যমাত্রাকে সামনে রেখে এই পরিকল্পনা সাজানো হয়েছে।

 

তবে অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীরা সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, কেবল কাগুজে পরিকল্পনা দিয়ে এই লক্ষ্য অর্জন সম্ভব নয়; বরং সরকারকে সবার আগে ‘ধার করে ঘি খাওয়ার’ অর্থাৎ বিশাল ঘাটতি বাজেট দিয়ে ঋণনির্ভর অর্থনীতি পরিচালনার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। একইসঙ্গে রাষ্ট্রীয় সম্পদ কুক্ষিগত করে রাখা শক্তিধর অলিগার্কদের আইনের আওতায় আনাই হবে বর্তমান সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় অগ্নিপরীক্ষা।

 

অর্থনীতির গণতন্ত্রায়ন লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য : গত রোববার এক অনুষ্ঠানে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী সরকারের এই নতুন অর্থনৈতিক দর্শনের কথা তুলে ধরেন। বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহারেও এই ইস্যুটিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছিল। এর মূল স্তম্ভগুলো হলো— অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি সমাজের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে আনুষ্ঠানিক অর্থনৈতিক কাঠামোর আওতায় আনা।

 

ক্ষমতায়ন: কৃষক ও নারীদের জন্য ‘ফ্যামিলি কার্ড’, ‘কৃষি কার্ড’ এবং ‘একটি গ্রাম একটি পণ্য’ প্রকল্পের মাধ্যমে স্থানীয় উৎপাদন বৃদ্ধি। অলিগার্কি নির্মূল: সম্পদ ও সুযোগকে নির্দিষ্ট কোনো গোষ্ঠীর একচেটিয়া অধিকার থেকে মুক্ত করে সবার জন্য উন্মুক্ত করা। প্রযুক্তিভিত্তিক শিল্পায়ন: কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করা।

 

ঘাটতি বাজেট ও ঋণের ফাঁদ থেকে উত্তরণ : বিশ্লেষকদের মতে, প্রতি বছর বিশাল অঙ্কের ঘাটতি বাজেট ঘোষণা করে বাহবা নেয়ার যে সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে, তা দেশের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। বিনিয়োগ বনাম ঋণ: অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আবু আহমেদ মনে করেন, সরকারকে ব্যাংক ঋণনির্ভরতা কমিয়ে শেয়ারবাজারের মাধ্যমে পুঁজি সংগ্রহের দিকে নজর দিতে হবে।

 

সরকারি কোম্পানিগুলোকে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত করে সাধারণ মানুষের মালিকানা নিশ্চিত করতে হবে। ব্যয় সংকোচন: অপ্রয়োজনীয় সরকারি ব্যয় ও মন্ত্রণালয়ের সংখ্যা কমিয়ে প্রশাসনিক সংস্কার করা জরুরি। ‘শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আদর্শে’ অনুপ্রাণিত হয়ে স্বনির্ভর বাংলাদেশ গড়তে হলে দেশি-বিদেশি ঋণের বোঝা কমানোর কোনো বিকল্প নেই।

 

লিগার্কদের দৌরাত্ম্য ও বাজার সিন্ডিকেট : বাংলাদেশ এমপ্লায়ার্স ফেডারেশনের সভাপতি ফজলে শামীম এহসান এবং বিজিএমইএ’র সাবেক সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী (পারভেজ) দেশের বাজার ব্যবস্থার করুণ চিত্র তুলে ধরেছেন। আমদানিতে একচেটিয়া আধিপত্য: এক সময় চিনি বা ডাল আমদানিতে শত শত ব্যবসায়ী থাকলেও এখন তা মাত্র ৪-৫ জন অলিগার্কের হাতে জিম্মি। ব্যাংকগুলো ছোট ব্যবসায়ীদের এলসি খুলতে না দিয়ে কেবল বড়দের সুবিধা দিচ্ছে। সুদহারের বোঝা: ১৪ শতাংশ সুদে ঋণ নিয়ে প্রকৃত ব্যবসায়ীদের পক্ষে টিকে থাকা অসম্ভব হয়ে পড়ছে। এতে কেবল ব্যাংক মালিকরাই লাভবান হচ্ছেন, আর সাধারণ উদ্যোক্তারা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।

 

কঠিন চ্যালেঞ্জ— দৃশ্যমান ব্যবস্থার অভাব : সরকারের তিন মাস পার হতে চললেও চিহ্নিত অনেক অলিগার্কের বিরুদ্ধে এখনো কঠোর কোনো ব্যবস্থা দৃশ্যমান হয়নি। কোনো কোনো ক্ষেত্রে অলিগার্কদের পুনর্বাসনের অভিযোগও উঠেছে।

 

বিশ্লেষকদের মতে, অলিগার্কদের আধিপত্য ভাঙতে না পারলে ‘অর্থনৈতিক গণতন্ত্র’ প্রতিষ্ঠা কেবল একটি রাজনৈতিক স্লোগান হিসেবেই থেকে যাবে। ১ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি গড়তে হলে আগামী ৮ বছরে বর্তমান ৪৬০ বিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিকে দ্বিগুণেরও বেশি বাড়াতে হবে, যা কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া অসম্ভব। সর্বোপরি, বাংলাদেশের সামনে এখন ১ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির হাতছানি, কিন্তু সেই পথে প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে দুর্নীতি, বিনিয়োগ খরা এবং প্রভাবশালী সিন্ডিকেট।

 

সরকারকে প্রমাণ করতে হবে যে, আইনের চোখে সবাই সমান এবং কোনো প্রভাবশালী গোষ্ঠীই রাষ্ট্রের চেয়ে বড় নয়। ‘অর্থনীতির গণতন্ত্রায়ন’ তখনই সফল হবে যখন একজন ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা বিনা বাধায় ঋণ পাবেন এবং সাধারণ মানুষ বাজার সিন্ডিকেটের হাত থেকে রক্ষা পাবেন। ঋণের বোঝা কমিয়ে স্বনির্ভরতার দিকে ধাবিত হওয়াই হোক আগামীর বাংলাদেশের মূলমন্ত্র। অন্যথায়, ১ ট্রিলিয়ন ডলারের স্বপ্ন কেবল সংখ্যার মারপ্যাঁচে আটকা পড়ে থাকবে।